রিপোর্টারের চোখে
বিচারক নিয়োগ, বদলি আর রায়—খালেদা জিয়ার মামলার অজানা অধ্যায়
পুরোনো ছবি
২০১৪ সাল। আমি সেদিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স একটা অনুষ্ঠানে। হঠাৎ ফোন এলো। ওপার থেকে, ‘ভাই, স্যার আপনাকে দেখা করতে বলেছে।’
স্যার মানে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা দুই মামলার এক বিচারক। মামলা দুটি হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট।
আমি অফিসে ফিরলাম। আমার তৎকালীন সম্পাদক নুরুল কবিরের কাছে গেলাম, ঘটনা খুলে বললাম। সম্পাদক বললেন ‘যদি কোনো “ক্লারিকাল মিস্টেক” হয় সরি হবেন, কিন্তু ফ্যাক্টস নিয়ে কোনো আপোস (compromised) নাই।’
কিছুটা ভয় নিয়ে গেলাম বিচারকের কাছে। পুরান ঢাকায় মহানগর বিচারালয়ে। তার কর্মকর্তাদেরকে বললাম, ‘স্যার আসতে বলেছেন। দুপুর বেলা।’
কিছুক্ষণ অপেক্ষা, তারপর বিচারকের খাস কামরায় ডেকে নিলেন। আমি সালাম দিয়ে ঢুকলাম। বিচারক ভদ্রলোকও সম্মানের সঙ্গে বসতে বললেন।
আমি তো জানি আমি কি লিখেছি। তবুও একটু নার্ভাস লাগছে। আমার বাড়ি কই, কি—এসব খোঁজ তিনি আগেই নিয়েছেন। তিনি শুরু করলেন তার নিজের গল্প দিয়ে। বললেন ওনার বাড়ি ঝিনাইদাহ। ভদ্রলোক আমার এলাকার সংসদ সদস্যকে চেনেন।
একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম স্যার, ‘আমাকে কেন ডেকেছেন। আমি কি কোনো ভুল করেছি।’
উনি চুপ থাকলেন। তিনি বললেন, ‘সেটা তো বলিনি।’ তাহলে? আমার প্রশ্ন।
তিনি বললেন, ‘আপনি যা লিখেছেন তা ভুল লেখেন নেই কিন্তু…’ বিচারকের বক্তব্যে আমি কিছুটা ইতস্তত। আমি বললাম, ‘আমি যা দেখেছি আমি তো তাই লিখেছি।’
‘যা দেখবেন তা লিখতে হয় না। আদালতে তো অনেক হয়।’ চেয়ারে বসে বিচারক বললেন।
আমি কথা বেশি কথা বাড়ালাম না।
আসলে আমি কি লিখেছিলাম? আমি লিখেছিলাম—খালেদা জিয়ার মামলায় আইন অনুযায়ী বিচারক খালেদা জিয়াকে জিজ্ঞেস করেননি, তিনি দোষী না নির্দোষ। এসময় আদালতে হট্টোগোল হলে বিচারক খাস কামরায় চলে যান। সেখানে বসে থেকে তিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুই মামলায় অভিযোগ গঠন করেন এবং তার পেশকার এজলাসে ঘোষণা দেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তারপর আমি কথা বলি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। তিনিও বলেছিলেন তাকে অভিযোগ পড়ে শুনানো হয়নি।
বিচারকের সঙ্গে দেখা হবার কদিন পর তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করে বিচারক হওয়া আবু আহমেদ জমাদারকে ওই মামলার বিচারক করা হয়। তিনি জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন বলে জানতে পারি।
তিনি অবশ্য খালেদা জিয়ার সঙ্গে কখনো অভদ্রতা করতেন না। তবে প্রায়ই বলতেন, ‘এ টা কোনো ক্যাঙ্গারু কোর্ট না।’ পরপর তারিখ দিয়ে বিচারটা এগিয়ে নিলেন।
২০১৪ সালে তার ছেলে বিসিএস পুলিশ হলো। তিনিও প্রমোশন পেলেন। চলে গেলেন। এরপর এলেন বিচারক আখতারুজ্জামান। এক সময় তার খুব প্রশংসা শুনেছি। বই লিখে সংসার চালানোর গল্প শুনেছি।
২০১৪ পর্যন্ত তিনি মোটামুটি পেশাদার ছিলেন। কিন্তু আনিসুল হক আইনমন্ত্রী হওয়ার পরে তাকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ হলো—বিডিআর মামলায় তিনি লিখেছিলেন প্রধান কৌশলি হিসেবে আনিসুল হক ঠিকভাবে কাজ করেননি। তাকে যখন সরিয়ে দেওয়া হলো আমি রিপোর্ট করলাম।
আখতারুজ্জামান বিডিআর মামলার বদৌলতে জেনারেল আজিজ আহমেদ-এর নৈকট্য পান। কারণ এ মামলার রায়ের সময় জেনারেল আজিজ বিজিবির মহাপরিচালক।
আনিসুল হকের বিরুদ্ধে রায় লেখার প্রায়শ্চিত্ত করতেই তাকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারক করা হয়। রায় দিলেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া ওই রায়ে দুই মামলায় পাঁচ বছর করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিলেন। তাকে পরে আরও দেখেছি। তার অধীনে নাজিমুদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গড়ে তোলা আদালতে বিচার কাজ পরিচালিত হয়।
শেখ হসিনার আমলে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হন আখতারুজ্জামান। এ বছর আগস্টে প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তার সই করা পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।
২০১৪ সালে অভিযোগ গঠন করা বিচারক সেদিন কেন আমাকে ডেকেছিলেন আমি জানার চেষ্টা করিনি। কারণ তিনি কোনো সংশোধনী বা প্রতিবাদ লিপি দেননি। অনুমান করি তিনি হয়তো অনুশোচনা থেকে আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। অথবা কোনো চাপে।
