Logo
Logo
×

সংবাদ

খালেদা জিয়া: সময়ের পরতে পরতে সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৫ পিএম

খালেদা জিয়া: সময়ের পরতে পরতে সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস

তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন—তিনি ছিলেন এক প্রতিরোধের প্রতীক।

ফেনীর ‘পুতুল’ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার যাত্রায় ছিল না প্রস্তুত কোনো রোডম্যাপ।

একটা সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন নিভৃত গৃহবধূ। তারপর ইতিহাস তাকে টেনে নেয় রাজনীতির উত্তাল মোহনায়।

স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর, এক চরম অনিশ্চয়তার মাঝে, তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপির চালক—একাই।

কারাবাস, অপবাদ, একতরফা নির্বাচন, রাজপথের আন্দোলন, ভাঙনের দ্বারপ্রান্ত থেকে দলকে টেনে তোলার গল্প—সবই খালেদা জিয়ার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

নির্বাচনে কখনো হারেননি।

জনতার ভালোবাসা ও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে একাধিকবার পৌঁছেও অহংকার করেননি।

শেষ জীবনে যখন তিনি রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছেন, তখনও ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫—তার চলে যাওয়ার দিন।

একজন নারী নেত্রীর অবসান, এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, ইতিহাসের পাতায় একটি স্থায়ী নাম—খালেদা জিয়া।

১৯৪৫: ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা খানম। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পুতুল’ নামে।

১৯৬০-এর দশক: সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। এ বিয়ের পর ধীরে ধীরে তার জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

১৯৭০-এর দশক: জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে খালেদা জিয়া হন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী। গৃহবধূ খালেদা তখনও রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।

১৯৮১: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর গভীর শোক ও শূন্যতার মধ্যে পতিত হয় তার পরিবার ও দল। এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন দিকহীন, তখন দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া।

১৯৮২–১৯৯০: স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আট বছর দীর্ঘ আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী হয়ে ওঠেন তিনি। কারাবরণ করেন, গৃহবন্দী হন, কিন্তু পিছু হটেন না।

১৯৯১: সব অনুমান মিথ্যা করে দেন। ‘আপসহীন নেত্রী’ খ্যাতি নিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে জয়ী করে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচন করে সব কটিতে জয়ী হন—বগুড়া–৭, ঢাকা–৫, ঢাকা–৯, ফেনী–১ ও চট্টগ্রাম–৮।

১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): একতরফা নির্বাচন করে পুনরায় ক্ষমতায় এলেও জনগণের চাপের মুখে ১১ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন। এই সময় সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযোজন হয়।

১৯৯৬ (জুন): আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও খালেদা জিয়া আবারও পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতেই জয়ী হন—বগুড়া–৬, বগুড়া–৭, ফেনী–১, লক্ষ্মীপুর–২, চট্টগ্রাম–১।

২০০১: অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও পাঁচটি আসনে (বগুড়া–৬, বগুড়া–৭, খুলনা–২, ফেনী–১, লক্ষ্মীপুর–২) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতে জয়ী হন।

তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০৬–২০০৭: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি হয় সংকট। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে পছন্দের ব্যক্তি বসাতে চাওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

এই পটভূমিতে সেনা-সমর্থিত এক-এগারো সরকার আসে। খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। সন্তানেরা হয়রানির শিকার হন। তবু আপস করেননি।

২০০৮: নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন (বগুড়া–৬, বগুড়া–৭, ফেনী–১)। তিনটিতেই বিজয়ী হন। তবে বিএনপির হাতে আসে মাত্র ৩০টি আসন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

২০১৪: বিতর্কিত নির্বাচনের আগে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। তার রাজনীতি ক্রমেই সীমিত হতে থাকে।

২০১৮: এক-এগারোর সময় দায়ের করা মামলায় সাজা হয়। খালেদা জিয়া কারাবন্দী হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।

২০২৪ (জুলাই): আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে। তিনি দেশ ছেড়ে যান।

৬ আগস্ট, দীর্ঘ বন্দীদশার পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া।

৭ আগস্ট: বিএনপির ঢাকার এক সমাবেশে ভিডিও বার্তা পাঠান। বলেন—

‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’

প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে একটি নেতিবাচক কথাও বলেননি।

২০২৫ (৩০ ডিসেম্বর): সকালে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ হারায় তার প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রীকে।

মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া: বিসিবি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিপিএলের খেলা স্থগিত করে।

সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল লেখেন, ‘তাঁর প্রয়াণে দেশ হারাল এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীককে।’

রাজনৈতিক অর্জন ও উত্তরাধিকার: খালেদা জিয়া দেশের একমাত্র রাজনীতিক, যিনি ২৩টি আসনে নির্বাচন করে সব কটিতে জয়ী হয়েছেন।

তিনি কখনও সংসদ নির্বাচনে হারেননি।

এক দশকের কম সময়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

একজন নারী হয়েও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য।

—

নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে। এক্স-এ দেওয়া শোকবার্তায় তিনি লিখেছেন,

‘ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরলোকগমনের সংবাদে গভীরভাবে শোকাহত।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

২০১৫ সালের ঢাকা সফরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ স্মরণ করে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘আমরা আশা করি, তার ভাবনা ও উত্তরাধিকার আমাদের অংশীদারিত্বকে ভবিষ্যতেও পথনির্দেশ করবে।’

পাকিস্তান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পৃথক শোকবার্তা দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট জারদারি বলেন, ‘তার নেতৃত্ব ও সেবাসমূহ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তার আত্মা শান্তিতে থাকুক।’

শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘খালেদা জিয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি পাকিস্তানের একজন নিবেদিত বন্ধু ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শোকের মুহূর্তে পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে আছে।’

চীনের শোকবার্তা

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি পাঠিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন।

চিঠিতে তিনি বলেন, ‘চীনা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার এবং বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের শোকবার্তা

ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘খালেদা জিয়া তার দেশের আধুনিক ইতিহাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর শোক

বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এক ফেসবুক পোস্টে শোক জানান।

তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন খালেদা জিয়ার ওপর রহম করুন, ক্ষমা করুন এবং জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার আপনজন, প্রিয়জন ও সহকর্মীদেরকে মহান আল্লাহ সবরে জামিল দান করুন। আমিন।’

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়া

বিশ্বের বহু শীর্ষ গণমাধ্যম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

রয়টার্স লিখেছে, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।’

বিবিসি শিরোনাম দেয়, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা গেছেন।’

সিএনএন বলেছে, ‘তিনি এক প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।’

এপি জানিয়েছে, ‘প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া মারা গেছেন।’

আল জাজিরা খবরে বলেছে, ‘লিভার সিরোসিসসহ বহু জটিল অসুস্থতায় ভুগে আজ ভোরে তার মৃত্যু হয়েছে।’

ডন, এনডিটিভি, দ্য হিন্দু, আনাদোলু—সবই তার মৃত্যুতে প্রকাশ করেছে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

দেশের ভেতরে প্রতিক্রিয়া

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের ক্রীড়া অঙ্গনেও শোক নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে,

‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে অসামান্য সমর্থন দিয়েছেন।’

এ কারণে আজকের (৩০ ডিসেম্বর) বিপিএলের দুটি খেলা স্থগিত করা হয়েছে।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল লিখেছেন,

‘তার প্রয়াণে দেশ হারাল এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীককে।’

এই শোকবার্তাগুলো ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরছে—খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ও উপমহাদেশীয় রাজনীতির এক অনন্য চরিত্র।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন