Logo
Logo
×

সংবাদ

টাকা চুরি নিয়েই মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে খুন: ডিএমপি

Icon

ইউএনবি

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:১৪ পিএম

টাকা চুরি নিয়েই মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে খুন: ডিএমপি

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাটে মা ও মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার কারণ উদঘাটন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। টাকা চুরি নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরেই প্রথমে গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজ এবং পরে তার মেয়েকে ছুরিকাঘাত করে গৃহকর্মী আয়েশা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এসএম নজরুল ইসলাম এ কথা জানান।

গতকাল বুধবার ঝালকাঠি থেকে অভিযুক্ত গৃহকর্মী আয়েশাকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের যা জানা গেছে, তা নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিএমপি।

গত ৮ ডিসেম্বর সকালে শাহজাহান রোডের ১৪ তলা একটি আবাসিক ভবনের সপ্তম তলার বাসায় লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়াকে (১৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর তথ্য প্রযু‌ক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভি‌ত্তিতে গৃহকর্মী বুধবার (১০ ডিসেম্বর) আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তি‌নি নল‌ছি‌টি এলাকায় তার দাদা শ্বশুর বাড়িতে আত্ম‌গোপনে ছিলেন।

এসএম নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর থেকেই আয়েশা ও তার স্বামী পলাতক ছিলেন। তবে মোহাম্মদপুর থানায় গৃহকর্মীদের যেসব তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত থাকে, সেগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনার ভিত্তিতেই তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর থানায় সংরক্ষিত একটি পুরোনো নথিতে থাকা আয়েশার ছবিতে গলায় পোড়া দাগ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়। ওই সূত্র ধরে তদন্তকারী দল জেনেভা ক্যাম্পে যায়, যেখানে আগের চুরির কারণে তিনি পরিচিত ছিলেন।

তার ভাষ্যে, ‘আয়েশা আগেও এক বাসায় চুরি করেছিল। গত ২৫ জুলাই আরেক বাসা থেকে ৮ হাজার টাকা চুরি করে ধরা পড়েছিলেন। সেটা নিয়ে জিডিও হয়েছে। এটা একটা ক্লু হিসেবে কাজ করেছে। তিনি তার নিজের বোনের বাসা থেকেও চুরি করেছেন।

‘আয়েশার শরীরের পোড়া দাগ নিয়ে আমরা দুই ধরনের তথ্য পেয়েছি। একবার বলেছেন যে তিনি মায়ের সঙ্গে কোনো এক সময় রাগারাগি করে নিজের গায়ে আগুন দিয়েছিলেন। অন্য এক জায়গা থেকে জেনেছি যে, কোনো এক বাসায় কাজ করার সময় চুলা থেকে আগুন লেগে তার গলা পুড়ে গেছে। আমরা দুটো তথ্যই ভেরিফাই করছি।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘চার দিন তিনি ওই বাসায় যাতায়াত করেছেন একদম পুরো মুখ ঢেকে। হত্যার পর সেফ এক্সিটের জন্য তিনি কাপড় বদলেছেন। পরে নিহত মেয়েটার কাপড় পরে ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যান।

‘জিজ্ঞাসাবাদে গৃহকর্মী আয়েশা বলেছেন যে, চুরির ঘটনার বিষয়টি পুলিশে জানানোর জন্য স্কুলে থাকা গৃহকর্তাকে ফোন করতে যাচ্ছিলেন লায়লা আফরোজ, ঠিক সেই মুহূর্তে আয়েশা প্রথম আক্রমণ করেন। প্রাথমিকভাবে তিনি আমাদের এটাই বলেছেন। মায়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় লায়লার মেয়ে যখন ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে জানাতে যায়, তখন আয়েশা মাকে রেখে মেয়েকে ছুরিকাঘাত করে। আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে এরকম তথ্য এসেছে।’

তিনি জানান, আয়েশা ছুরি ধুয়ে বালতিতে রেখে ল্যাপটপ, একটি মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র ব্যাগে নিয়ে পালিয়ে যান। পরে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান এবং সাভারের দিকে রওনা হন। চুরি করা ফোন ও রক্তমাখা পোশাক তিনি সিংগাইর ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেন। যেহেতু আয়েশা বোরকা পরতেন, সিসিটিভি ফুটেজে তার মুখ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছেও তার সঠিক ঠিকানা ছিল না, যার ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

অতিরিক্ত কমিশনার আরও জানান, আয়েশার পোড়া দাগ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে। আমরা এরপর গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় গৃহকর্মীর চুরির ঘটনা বিশ্লেষণ করে জুলাই ২০২৫ সালে হুমায়ুন রোডে ৮ হাজার টাকা ও একটি সোনার আংটি চুরির ঘটনার সঙ্গে মিল পাই। ওই মামলার সন্দেহভাজনের নামও আয়েশা, যার গলায় পোড়া দাগ ছিল বলে জানতে পারি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে আয়েশার সঙ্গে যোগাযোগের একটি মোবাইল থেকে নম্বর পাওয়া যায়। উক্ত নম্বরে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তার মোবাইল নম্বরটি কখন কে ব্যবহার করেছেন তিনি সঠিক মনে করতে পারছেন না। তবে কিছুদিন আগে তার ফোনের ডিসপ্লে নষ্ট থাকায় রাব্বী নামে তার এক ছোট ভাইকে ঠিক করার জন্য দেন এবং এই সময় সিমটি রাব্বীর ফোনে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এভাবে রাব্বীকে সনাক্ত করা হয়।

গতকাল (বুধবার) ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা থেকে অভিযুক্ত গৃহকর্মী আয়েশা ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি: ডিএমপি

তিনি জানান, রাব্বীর স্ত্রীর নাম আয়েশা, সে মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে। আরও জানা যায়, তারা জেনেভা ক্যাম্পে ভাড়া বাসায় থাকে। এভাবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারী আয়েশার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।

আয়েশাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ প্রথমে হেমায়েতপুরে তার মায়ের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে। তার মা জানান, তারা রাতে বাসায় ছিল, কিন্তু সকালে বের হয়ে গেছে। আয়েশার মাকে নিয়ে পুলিশ রাব্বীর মায়ের বাসায়ও যায়, কিন্তু সেখানেও তাদের পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে পুলিশকে জানানো হয়, তারা বরিশালে গিয়ে থাকতে পারে।

এক পর্যায়ে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় পটুয়াখালীর দুমকি থানাধীন প্রত্যন্ত নলুয়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা চালায় পুলিশ। সেখানেও তাদের না পেয়ে পরবর্তীতে এডিসি মোহাম্মদপুরের নেতৃত্বে থাকা পুলিশের আভিযানিক দল ঝালকাঠি জেলার নলছিটি থানার চরকারা গ্রামে আয়েশার দাদা শ্বশুরবাড়িতে বুধবার অভিযান চালিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আয়েশা ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কক্ষ তল্লাশি করে একটি চোরাই ল্যাপটপও উদ্ধার করা হয় বলে জানান তিনি।

অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একইসঙ্গে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় তার চুরি করার অভ্যাস আগে থেকেই ছিল বলে জানা গেছে। আমরা তদন্তের খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। তাদের পেছনে কোনো সিন্ডিকেট আছে কি না, এটা নিয়ে আমরা আরও তদন্ত করব।’

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন