Logo
Logo
×

সংবাদ

জামায়াত–শিবির কি সামাজিক সহানুভূতি হারাবে?

মুক্তাদির রশীদ

মুক্তাদির রশীদ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫৮ পিএম

জামায়াত–শিবির কি সামাজিক সহানুভূতি হারাবে?

ছবি: সংগৃহীত

আমার জন্ম ও বড় হওয়া বামপন্থি অধ্যুষিত বৃহত্তর যশোরে। আমার স্মৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও কমরেড আব্দুল হকের চরিত্র শক্ত। ফলে মানুষের মুক্তির লড়াই সম্পর্কে কিছু বোঝাপড়া সামাজিকভাবেই পেয়েছি। একই কারণে সামাজিক বিভাজন, শ্রেণিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় রাজনীতি বিষয়েও ধারণা পেয়েছি সহজেই।

সেইসব বোঝাপড়ার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ বিষয় ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। রাজাকার-আলবদর শব্দ দুইটাই ঘৃণার প্রতিশব্দ হিসেবেই দেখত মানুষ। এমনকি রাজাকার হিসেবে অভিযুক্ত লোকের মুখেও শব্দটির প্রতি নিন্দাই দেখতে পেয়েছিলাম। হয়তো তা লোকদেখানো। কিন্তু দেখা যেত। 

জামায়াতে ইসলামীর লোকজন নানা লুকোছাপার মধ্যে থাকতেন। ১৯৭১ সালের পরে এলাকায় ছাত্রসংঘ ছিল না। তবে আশির দশকে নতুন নাম ছাত্রশিবিরের অবস্থান দেখা যায়। আর জামায়াত তাদের কার্যক্রম শুরু করে আল-আমিন স্কুল আর এতিমখানার মতো সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে।

এলাকায় যারা ফুরফুরা পীরের মুরিদ, তারা জামায়াত বা শিবিরকে কখনোই সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেনি। আমাদের সামনে এদের বরাবরই ‘ফেতনাবাজ’ হিসেবে উপস্থাপন করতেন তারা। তবে এর মধ্যেও কিছু বড় ভাইকে শিবিরের নেতা হিসেবে দেখেছি। তাদের অনেককে সম্মান করতাম, এখনো করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা শিবিরের। একসাথে চলেছি, নামাজ পড়েছি বা কনসার্ট দেখেছি। তাদের সাথে আমার রাজনৈতিক দ্বিমত ছিল, কিন্তু একসাথে চলেছি, থেকেছি। পরবর্তীতে কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউবা জামায়াত-ভিন্ন অন্য দলে যোগদান করেছে। গত ১৮ বছরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝে তাদের টিকে থাকতে দেখেছি।

দীর্ঘদিন মিশে দেখেছি—তাদের সংগঠন সপ্তম শ্রেণি থেকেই খুব যত্ন করে একটি টার্গেট সামনে রেখে একজন কর্মীকে গড়ে তোলে। বামপন্থিরা অতীতে করেছে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর শিবিরের মতো করে একজন ছাত্রকে এত যত্ন করে কেউ গড়ে তুলেছে—তেমনটি জানা নেই। তাই তাদের দায়বদ্ধ কিশোর যখন তরুণ বা যুবক হয়েছে, তারা আকিদা হারালেও রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস করেনি।

আরেকটা বিষয় হলো—অন্যান্য ছাত্র সংগঠন সাধারণত কলেজ থেকে কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু শিবির সাংগঠনিকভাবে কাজ শুরু করে উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই।

৭০–৮০ দশকে রাজশাহী বা চট্টগ্রামে সংঘাত করে টিকে থেকে তারা একসময় নিজেদের মধ্যে চারটি শাখা তৈরি করে।

১. সহিংস গ্রুপ

একটা গ্রুপ যারা সহিংস—ধর্ম তাদের শক্তি, কিন্তু ক্ষমতা তাদের উদ্দেশ্য। অনেকে অস্ত্রধারী। চট্টগ্রামের জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীরা এর উদাহরণ। এদের বাচ্চাকাচ্চারাই অনেক ক্ষেত্রে সহিংস। এ ঘরানার মানুষেরা কারও মায়ের মৃত্যু সংবাদে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেয়। বায়োতে কোরআনের আয়াত লিখে রাখবে, কিন্তু আপনাকে ও আপনার মাকে নিয়ে শরীয়তের বাইরে গিয়ে গালি দেবে।

২. আদর্শিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পেশাজীবী গ্রুপ

এরা শিবির-জামায়াতের আদর্শিক ধারায় বেড়ে উঠলেও সরাসরি সাংগঠনিক অবস্থান নেয় না। সরকারি চাকরি, ব্যবসা, করপোরেট, একাডেমিয়া, সাংবাদিকতা বা পেশাজীবী সংগঠনে থাকে। এদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। আর্থিকভাবে অনেকেই সৎ। আপনাকে হাসিমুখে গ্রহণ করবে, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখবে। টাই-শার্ট-প্যান্ট পার্টি সবই আছে এদের যাপিত জীবনে।

এদের অনেকে মনে করে—১৯৪১-এর শতবর্ষে বাংলাদেশে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে এরাই সরকারকে শক্তিশালী করবে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমী ঘরানা এর উদাহরণ।

৩. ‘মেধাবী ছাত্র’ মডেল (বর্তমান জামায়াতের ভবিষ্যৎ)

এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংগঠিত মডেল। শিবির অনেকটা USSR-এর মতো মেধাবী ছাত্র ‘হান্ট’ করে। গ্রাম → শহর → বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ি ও গাইডেন্স নিশ্চিত করে।

২০০৭-এর পর তারা মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুর্কিতে ‘হিজরত’ করেছে; তারপর অনেকে দেশে ফিরে এসেছে। মালয়েশিয়ার মডেলই এখন বাংলাদেশে প্রয়োগ হচ্ছে।

দৃশ্যত লিবারেল মনে হলেও মূল উদ্দেশ্য ইসলামিজম—‘আমাদের ভার্সন অব মুসলিম ব্রাদারহুড’। মিসরের উদাহরণ মাথায় রেখে সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরির বয়ানও তারা দেয়।

৪. সাধারণ ধর্মপ্রাণ রাজনৈতিক সমর্থক

মুসলিম লীগের ক্ষতিগ্রস্ত প্রজন্ম—ধর্মকে মূল্য দেয়, কিন্তু খুব সংগঠিত রাজনীতিতে নেই। অন্য দলে মানিয়ে নিতে পারে না। সমাজে টিকে থাকতে জামায়াতে সমর্থন রাখে। এরা আদর্শিকভাবে হিযবুত-তাহরির ঘরানার, কিন্তু জামায়াতের প্রতি মহব্বত আছে। এদের বড় অংশ প্রবাসী। আমার মতো নিরীহ লোকজন ২ বা ৪ নম্বর গ্রুপে পড়ে যায়।

কিন্তু ৩ নম্বর গ্রুপটাই জামায়াতের ভবিষ্যৎ—যেখানে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সেখানে কে দূরে যায় বলুন?

অতীতে তারা বিএনপিকে আদর্শিক মিত্র মনে করত। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে অবস্থান নিতে না পারায় অনেকে আবার জামায়াতে ফিরে গেছে। কেউবা রঙ পাল্টে লুকিয়ে থেকেছে। পুলিশেও এমন অনেককে দেখেছি—একেকজন একেকটা কাল্ট হয়ে উঠছে।

সমস্যা হলো—আওয়ামী লীগ যেমন দলকে ধর্ম বানিয়ে ফেলেছিল, তারাও সেদিকে হাঁটছে। অনেকটা ভারতের বিজেপির মতো। তারা ভারতের মতো ধর্ম বিপদে—এই বয়ান তুলে মব তৈরি করে, কোরবানির গরু/গো-হত্যা ইস্যুর মতো বিষয় ধার করছে। মিডিয়াকে প্রভাবিত করতেও কৌশল দেখাচ্ছে।

শিবির থেকে জামায়াত হওয়া অনেকে দাবি করে—তাদের ইন্টারনাল মেকানিজম খুব শক্তিশালী। আমিরের ভুল নিয়েও সমালোচনা করা যায়। কিন্তু এতে তাদের ভেতরের দ্বিচারিতা বোঝা যায়।

যেমন—শাহজাহান চৌধুরী সাহেবের সাম্প্রতিক প্রশাসন দখলের বক্তব্যে তারা প্রকাশ্যে সমালোচনা করবে না, বরং ন্যায্যতা দেবে।

১৯৭১ সালের ভূমিকার পরেও আওয়ামী শাসনামলের দীর্ঘ নির্যাতনে সমাজে তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। রিমান্ডের নামে নির্যাতন দেখে শিবির–জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রতি অনেকের মায়া জন্মায়—ভাবা হয়েছিল তারা অন্তত আওয়ামী লীগের মতো স্বৈরাচার হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুকে জামায়াত-সমর্থিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে সেই মাসুদের বৈঠক কিংবা পাবনায় নির্বাচনী প্রচারণায় আগ্নেয়াস্ত্রের প্রদর্শন ভয়াবহ। আরও আতঙ্কজনক হলো—‘ষড়যন্ত্রকারীরা’ সুযোগ নেবে ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের মব-টার্গেট করতে।

আজকের ফ্যাক্টচেক প্রজন্ম দেখছে—ধর্মের বিকৃত প্রচারণা, গাজওয়াতুল হিন্দ জিহাদি টোন, ইসলাম কায়েমের যুদ্ধ—এ সবকিছু ভারতের আরএসএস-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।

৩ ডিসেম্বর রংপুরের জনসভায় জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান বলেছেন—‘জুলাই আন্দোলনে দ্বিতীয় স্বাধীনতা পাওয়া গেছে, কিন্তু যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি… আরেকটা যুদ্ধ বাকি—এই দেশের মাটিতে কোরআনের আইন কায়েমের যুদ্ধ।’

এ ধরনের বয়ান কেবল সংঘাত ডেকে আনে না, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে। সমালোচনা করলেই মুখ বন্ধের চেষ্টা শুরু হয়।

আমি সত্যিই ভেবেছিলাম ৫ আগস্টের পরে পরিবর্তন আসবে—তারা মজলুম থেকে জালিম হয়ে উঠবে না। কিন্তু আজ জামায়াত বা শিবির ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা ব্যবহার করে ক্ষমতার স্বাদ নিতে চাইছে। মজলুম থেকে জালিম হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সেটাই হয়তো তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে।

লেখক : সাংবাদিক

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন