Logo
Logo
×

সংবাদ

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ভারত শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বড় বাধা

Icon

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৫১ পিএম

ভারত শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বড় বাধা

শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। পিতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭০-এর দশকে তার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। পরে তিনি দেশের রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছান। কিন্তু তিন দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ক্ষমতা থেকে নাটকীয়ভাবে পতন হয় তার। তিনি পালিয়ে চলে যান ভারতে। তার অনুপস্থিতিতেই আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন—এখন রায় কার্যকর হতে পারে যদি নয়াদিল্লি তাকে ফেরত দেয়।

২০২৪ সালের ছাত্র বিক্ষোভে সহিংস দমন-পীড়নের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। বিক্ষোভে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবির পাশাপাশি তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের তথ্যমতে, দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। আন্দোলনের চাপ বাড়তে থাকলে তিনি গত বছরের আগস্টে ভারত পালিয়ে যান এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।

ঢাকা এখন তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করতে প্রত্যর্পণ দাবি করছে। রায়ে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের হত্যায় তিনি নির্দেশ দিয়েছেন—এমনকি ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারেও অনুমোদন ছিল তার।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা-অভ্যুত্থানে তার বাবা, মা, তিন ভাই নিহত হন। তিনি ও তার বোন সে সময় জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ৬ বছর ভারতের নির্বাসন তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং ভারতের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা গড়ে তোলে।

১৯৮১ সালে দেশে ফিরে জনসমর্থনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। শুরু হয় ‘বেগমদের লড়াই’—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ।

ক্ষমতায় ফেরা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ

১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে এক কৌশলী, কঠোর এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্ব হিসেবে দেখা যায়। ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ সাফল্য থাকলেও সমালোচকেরা অভিযোগ করেন—তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ ওঠে। ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ায় তিনি ছিলেন নয়াদিল্লির অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র।

ছাত্র আন্দোলনে পতন

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও তা দ্রুতই দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন আন্দোলনকে দমন করতে ব্যর্থ হয় বরং জনঅসন্তোষ আরও তীব্র করে। শেষে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোবাশ্বার হাসান বলেন, “তিনি সীমা অতিক্রম করেছিলেন। জনগণ, বিভিন্ন বাহিনী—সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।”

মৃত্যুদণ্ড ও আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুপস্থিতিতে তার বিচার হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে রায় ঘোষণার সময় করতালি ও কান্নায় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

ভুক্তভোগী এক নিহত ছাত্রের বাবা আবদুর রব বলেন, “রায় কিছুটা শান্তি দিয়েছে। তবে তার ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ শান্তি আসবে না।”

শেখ হাসিনা রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে আপিলের সুযোগ রেখেছেন। সুপ্রিম কোর্টে আপিল এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যাওয়ার পথও খোলা।

ভারত কি প্রত্যর্পণ করবে?

যে ভারতকে তিনি ‘ঐতিহাসিক বন্ধু’ হিসেবে দেখতেন, এখন সেই দেশ তার ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। ভারতের প্রত্যর্পণ আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী—রাজনৈতিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে ফেরত না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুণায়েত মনে করেন, ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া নিয়ে ‘তাড়াহুড়ো করবে না।’ কারণ,

১. তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক হতে পারে—এ যুক্তি দেখানো সম্ভব।

২. তিনি এখনো আইনি প্রতিকার শেষ করেননি।

তবে ঢাকা বলছে—দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী তাকে হস্তান্তর করা ভারতের দায়িত্ব।

অঞ্চলীয় রাজনীতির অনিশ্চয়তা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত উদ্বিগ্ন যে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

এদিকে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে—আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন