Logo
Logo
×

সংবাদ

জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা যা বললেন প্রধান উপ‌দেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:১৮ পিএম

জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা যা বললেন প্রধান উপ‌দেষ্টা

জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় তার এ ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি নিউজ ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সম্প্রচার করা হয়।

ভাষণের শুরুতে প্রধান উপ‌দেষ্টা বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধীক্ষণে উপনীত হয়েছে। আমাদের সরকারের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব ছিল মূলত তিনটি: হত্যাকাণ্ডের বিচার করা; একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের আয়োজন করা; এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। 

প্রধান উপ‌দেষ্টা আরও বলেন, আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এই বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল তাদের প্রথম রায় শীঘ্রি দিতে যাচ্ছে। ট্রাইবুনালে আরো কয়েকটি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ ফৌজদারী আদালতগুলোতে জুলাই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত কিছু বিচার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা একই সাথে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত 'গুমের মত প্রশংস' অপরাধের বিচার কাজ শুরু করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাতে চাই যে সংস্কারের ক্ষেত্রেও আমরা ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছি। অন্তর্বর্তী সরকার নিজ উদ্যোগে বা বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করেছে। কিছু প্রস্তাবিত সংস্কারের কাজ এখনো চলমান আছে।

অধ্যাদেশের মাধ্যমে বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন সম্প্রসারণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্কার সম্পন্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সুশাসনের জন্য এসব সংস্কার বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। আশা করি আগামী নির্বাচিত সরকার সংসদে আলোপালোচনার মাধ্যমে এসব সংস্কার গ্রহণ করবে। আমাদের আরেকটি গুরু দায়িত্ব হচ্ছে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠান। আমি ঘোষণা করেছি যে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠভাবে অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আমরা সঠিকভাবে পালন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

প্রিয় দেশবাসী, রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যমত্ব কমিশন নিরলসভাবে গত প্রায় নয় মাস ধরে কাজ করেছে। এ সময় কমিশন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা করেছে। অত্যন্ত সৌহার্যপূর্ণ পরিবেশে ধৈর্য সহকারে রাজনৈতিক দলগুলো কমিশন কর্তৃক উত্থাপিত বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। মতের পার্থক্য থাকলেও তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। অনেক বিষয়ে ঐক্যমত্বে আসতে পেরেছেন। দেশবাসী সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে এই পুরো কার্যক্রম দেখতে পেরেছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে তো বটেই, পৃথিবীর অনেক দেশের জন্য এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য আশা ব্যঞ্জনক। আমি ঐক্যমত্য কমিশনের সদস্যদের এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে গণতান্ত্রিক চর্চার এই অসাধারণ আয়োজনকে সফল করার জন্য আবারো আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ঐক্যমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধান বিষয়ক 30 টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্ব তৈরি এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিছু প্রস্তাবে সামান্য ভিন্ন মত আছে। বাকি অল্প কিছু প্রস্তাবে আপাতত দৃষ্টে মনে হয় অনেক দূরত্ব আছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক কিছু না। তবে ক্ষতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে এসব প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রেও আসলে মতভিন্নতা খুব গভীর নয়। কেউ সংস্কারটা সংবিধানে করতে চেয়েছেন, কেউ আইনের মাধ্যমে করতে; কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে কারো মধ্যে মতভেদ নেই।

কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য বক্তব্য যতখানি পরস্পর বিরোধী অবস্থানে আছে বলে মনে হয়, জুলাই সনদ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে ততখানি মতপার্থক্য দেখা যায় না। এটি আমাদের অনন্য অর্জন। এতে জাতি এগিয়ে যেতে সাহসী হয়। এসব বিবেচনায় রেখে এবং রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে মূল দলিল হিসেবে ধরে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আজকের উপদেষ্টা মন্ডলী সভায় 'জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫' অনুমোদন করেছে। এটা বিরাট খবর। প্রয়োজনীয় সাক্ষর শেষে এটি ইতিমধ্যে গ্যাজেট নোটিফিকেশন করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের এই আদেশে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবনার উপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত। আমরা সকল বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারি প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না। নির্বাচন আরো উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। জুলাই সনদের আলোকে আমরা গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্ন নির্ধারণ করেছি। আমি প্রশ্নটি এখন আপনাদের সামনে পাঠ করে শোনাচ্ছি।

প্রশ্নটি হবে এরকম: "আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫এবং জুলাই জাতীয় সনদের লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?"

ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধয়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের উপর একটি মাত্র প্রশ্নে আপনি হ্যাঁ বা না ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন। গণভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট হ্যাঁ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিগণ একই সাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটিও আজকে অনুমোদিত আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী, অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অর্থনীতিকে গভীর গহ্বর থেকে উদ্ধার করা ছিল আমাদের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। গত 15 মাসে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ উতরাতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রিজার্ভ সহ অর্থনীতির সবগুলো সূচকে দেশ ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাত ইতমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। ব্যাংকিং খাতকে আরো শক্তিশালী করতে নানামুখী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বছরে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৯.৩ % বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে এক অনন্য অর্থনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আগামী সপ্তাহে ডেনমার্ক ভিত্তিক মারস গ্রুপের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালস বিভিভি এর সঙ্গে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় এই কোম্পানি ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এটি এই যাবৎকালে বাংলাদেশে ইউরোপের সর্বোচ্চ একক বিনিয়োগ। লালদিয়া হবে দেশের প্রথম বিশ্বমানের গ্রীন পোর্ট।

প্রিয় দেশবাসী, প্রায় দেড় যুগ ধরে আমাদের জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তারা আজ আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তা না হলে জাতি এক মহা বিপদের সম্মুখীন হবে। এ সম্পর্কে আমি আগেও একাধিকবার আমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছি। ফেসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ এর জুলাইয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি শীর উঁচু করে দাঁড়িয়ে দেশবাসী যে ঐক্য গড়ে তুলেছিল, আমরা জীবিতরা যেন অল্পস্বল্প ভিন্ন মত ও লঘু বিবাদে জড়িয়ে তার মর্যাদা ক্ষুন্ন না করি। ১৩৩ শিশু, শত শত তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষের মৃত্যু, হাজার হাজার মানুষের অঙ্গহানির যে আত্মত্যাগ, সেটিকে আমাদের সম্মান জানাতেই হবে। দেশের আপামর জনগণ সামান্য যা চায়, তা হচ্ছে এই অগণিত হতাহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা সবাই যেন ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা দেখাই, দলীয় স্বার্থ অতিক্রম করে সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় চাওয়াকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরি। তাই আমি আশা করি আমাদের এই সিদ্ধান্ত জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে। একটি উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচনের দিকে জাতি এগিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশে প্রবেশ করব। আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ার দ্বার প্রান্তে এসে পৌঁছলাম। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হন। আমাদের আশা মহান আল্লাহ পূরণ করুন। আল্লাহ হাফেজ। সবাইকে ধন্যবাদ।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন