ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন
বাংলাদেশের জেন-জি বিপ্লব কি ব্যর্থ হচ্ছে?
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:১৪ পিএম
অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো দীর্ঘ আট বছর। যেখানে আলো-বাতাসের প্রবাহ থমকে যায়। একজন বন্দীকে থাকতে হয় তেলাপোকা, ইঁদুর আর মশার সঙ্গে। দিন-রাতের পার্থক্য বোঝা যায় না। সেই প্রকোষ্ঠে একজন মানুষের একমাত্র কামনা হয়ে ওঠে মৃত্যু। এমনই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে গুম হওয়া মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)।
তিনি বলেন, “সেখানে আমার কিছুই করার ছিল না। প্রতিটি রাতেই কারারক্ষীদের আসার প্রতীক্ষায় থাকতাম—ভাবতাম তারা এসে হয়তো আজ আমাকে নিয়ে যাবে।”
জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর পুত্র আরমান। ২০১৬ সালে গুম হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তার পিতার আইনজীবী হিসেবে কাজ করছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে বহু মানুষকে গোপন স্থানে বন্দী রাখা হতো—যার নাম ‘আয়নাঘর’। সেখানে বন্দীদের হাত ও চোখ বেঁধে রাখা হতো। শতাধিক বন্দীর সঙ্গে সেখানে ছিলেন আরমানও।
ভয়াবহ সেই বন্দীদশা থেকে তিনি মুক্তি পান গত বছরের ৬ আগস্ট। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম আমাকে হত্যা করা হবে। দোয়া কালাম পড়ছিলাম। কিন্তু একসময় চোখের বাঁধন খুলে আমাকে এক মাঠে ফেলে রেখে যায় তারা।”
তার মুক্তির ঠিক মাস খানেক আগে বাংলাদেশে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই অভ্যুত্থানকে ‘বর্ষা বিপ্লব’ বা ‘মুনসুন রেভ্যুলেশন’ নামে আখ্যা দেয়। সেই আন্দোলনে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের। তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
আরমান মুক্তির পর এই সংবাদ শুনে আবেগে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছি।”
কার্যত হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের পরিকল্পনা করে ছাত্র নেতারা। তারা বাংলাদেশের পরবর্তী নেতা হিসেব শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেছে নেন। পরে তার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। হাসিনার দখলদারিত্বের রাজনীতির অবসানসহ সামাজিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে হওয়া গুম, খুন ও শত শত কোটি পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন তারা। তবে এখনকার পরিস্থিতি হলো ত্রয়োদশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এই ক্ষেত্রে ১৭ কোটি জনগণের দেশটির ঐক্য ধরে রাখতে সংগ্রাম করছেন ড. ইউনূস।
এদিকে বিশ্বাস হারাচ্ছে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত-এর সম্ভাবনা। কেননা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরানো সেই পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিই ফের প্রভাব বিস্তার করছে। সমাজে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দানা বেঁধে উঠছে। কট্টর ইসলামপন্থীদের উত্থানের শঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে আওয়ামী লীগ বলে বেড়াচ্ছে যে, তাদের কিছু নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ড. ইউনূসের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সকল দলের মধ্যে সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলা ড. ইউনূসের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন নানাবিধ কারণে গণঅভ্যুত্থানকে অনেকেই একটি মিথ্যা ভোর হিসেবে বিশ্বাস করা শুরু করেছেন। ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির বলেন, ‘আমাদের জাতীয় ঐক্যের একটি বিরল মুহূর্ত ছিল, যা এখন পুরোপুরি নেই হয়ে গেছে। আমরা পুরোপুরি বিভক্ত, আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছি।’
এদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখনও জনগণের প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। হাসিনার ফাঁসির দাবির ব্যানারে ভরে আছে রাজধানীর সড়কগুলো। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ভয়াবহ গণহত্যার মূলহোতা মনে করা হয় তাকে। ব্যানারগুলোতে হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে কয়েক ডজন শিশুও আছে। বেশিরভাগই নিহত হয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রথম পদক্ষেপ ছিল এসব হত্যার বিচার শুরু করা। এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে প্রধান প্রসিকিউটর করা হয়। তিনি বলেন, “গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্দেশ, পরিকল্পনা ও প্ররোচনার দায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে।”
ঢাকা সরকার ইতিমধ্যেই ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে, তবে নয়াদিল্লি এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো সাড়া দেয়নি। প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, ভারত চাইলে রাজনৈতিক কারণে এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
শেখ হাসিনা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পিতা মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। তার ৮০ বছর বয়সী মা খালেদা জিয়াও কয়েক দশক ধরে বিএনপির দায়িত্বে ছিলেন। পরে তা ছেলের কাছে হস্তান্তর করেন।
ছাত্রনেতাদের অন্যতম নাহিদ ইসলাম। তার নেতৃত্বে তরুণদের নতুন দল গঠিত হয়েছে। যার নাম এনসিপি বা জাতীয় নাগরিক পার্টি। তিনি মনে করেন দেশের রাজনীতিতে স্বাভাবিক ধারা ফিরে আসা উচিত। নাহিদ বিশ্বাস করেন, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ধারা, দুর্নীতি এবং জনগণকে মূল্যায়ন করে না এমন রাজনীতির বিরুদ্ধেই গত বছর গণঅভ্যুত্থান করেছে এ দেশের মানুষ। তারা যখন রাস্তায় নেমেছে তারা শুধু একটি সরকারের উৎখাত চায়নি বরং পুরনো রাজনীতির বিলোপের মাধ্যমে আইনের শাসন, ন্যায্যতা, জবাবদিহিতা এবং নিজেদের মর্যাদার দাবি জানিয়েছে। তার ধারণা, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু নাও হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের জন্য জটিল ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন সামলানো এবং গার্মেন্টস খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য এটি হবে কঠিন পরীক্ষার সময়।
