তের মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৬০ জন নিহত এবং আহত ৮০৫০: এইচআরএসএস
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫, ১১:১৮ পিএম
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তের মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর) কমপক্ষে ১০৪৭টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬০ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮ হাজার ৫০ জন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) থেকে পাঠানো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম তের মাসের রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের তের মাস অতিবাহিত হলেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি । গণ-অভ্যুত্থানের তের মাস পরেও মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা উদ্বেগজনক। নতুন বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের প্রত্যাশা থাকলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্বের ধারা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি এতে নতুন কিছু ধারাও যুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তের মাসের (সেপ্টেম্বর’২৪-সেপ্টেম্বর’২৫) মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের উপর হামলা, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন এবং সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস ও নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। গত ১২ মে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আদালত ও কারা ফটকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর হামলা; থানা ও পুলিশের ওপর হামলা করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে । দেশে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে ও বিশেষ অভিযানে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ১৬ জুলাই, ২০২৫ তারিখে গোপালগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি কেন্দ্রিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যৌথ বাহিনীর সংঘর্ষে ও গুলিতে ৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। ৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড) সামনে জনসম্মুখে ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী মোঃ সোহাগকে তার দলের লোকেরা যেভাবে নির্মমভাবে পিটিয়ে, কুপিয়ে এবং শরীর থেঁতলে হত্যা করেছে—সেটা ছিল অত্যন্ত বর্বর, ভীতিকর এবং উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন হেনস্থা ও গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। ২৯ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইল বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদের সাথে জাতীয় পার্টির সংঘর্ষের পর গণঅধিকার পরিষদের কর্মসূচিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হামলায় সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এই ঘটনার জেরে ৩০ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের কয়েকটি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ১৫ টি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তের মাসের (সেপ্টেম্বর’২৪-সেপ্টেম্বর’২৫) “রাজনৈতিক সহিংসতার” বিষয়ে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তের মাসে (সেপ্টেম্বর’২৪-সেপ্টেম্বর’২৫) কমপক্ষে ১০৪৭ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮০৫০ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ১০৪৭ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপি ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তর্কোন্দলে ৫৭৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৩৩৭ জন ও নিহত ৮৮ জন, ২২১টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১৪১ জন ও নিহত ৩৪ জন, ৫১টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪১১ জন ও নিহত ২ জন, ১৮টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৪০ জন, ২০টি আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৬ জন ও নিহত ১ জন, ১১টি আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩ জন ও নিহত ২ জন, আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে ২৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫০ জন ও নিহত ১২ জন, এনসিপির অন্তর্কোন্দলে ১৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬২ জন, জামায়াতের অন্তর্কোন্দলে ১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪ জন, ৪টি জাতীয় পার্টি-গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৩ জন, পুলিশ-গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩০ জন এবং ৮৩টি ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন দলের মধ্যে যেখানে আহত হয়েছেন ৪৪৭ জন ও নিহত ২১ জন । ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে ১১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮৬ জন, এবং ছাত্রদলের অন্তর্কোন্দলে ৩৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩২০ জন ও নিহত ৩ জন। নিহত ১৬০ জনের মধ্যে বিএনপির ১০৪ জন, আওয়ামী লীগের ৩৮ জন, জামায়াতের ৩ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ১ জন এবং ইউপিডিএফের ১০ জন। অপর ৪ জনের রাজনৈতিক পরিচয় মেলেনি যার মধ্যে ১ জন নারী রয়েছেন। ১০৪৭ টি সহিংসতার ঘটনার ৮৮৮ টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। এর পাশাপাশি সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৭১টি ঘটনায় অন্তত ১২০ জন নিহত হয়েছেন এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। এসকল হামলায় যারা নিহত হয়েছেন তারা অধিকাংশই বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও গত তের মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় দুই শতাধিক গুলিবিদ্ধ, সাত সহস্রাধিক বাড়ি-ঘর, রাজনৈতিক কার্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
বিগত বছরগুলোর সাথে তুলনা:
২০২১ সালে অন্তত ৪৬০ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮২ জন, আহত হয়েছে ৪৩৫২ জন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছে ১৯৪ জন, যার অধিকাংশ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। ২০২২ সালে অন্তত ৭৫৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছে ৯২ জন, আহত হয়েছে ৭৭৮৯ জন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছে ১২৩ জন, যার অধিকাংশ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। ২০২৩ সালে অন্তত ৯২১টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯৬ জন ও আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৯২১৯ জন। যার অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তের্কান্দল এবং বিএনপির পদযাত্রা ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের পাল্টা শান্তি সমাবেশ কেন্দ্রিক সংঘর্ষে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। আর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তের মাসে (সেপ্টেম্বর’২৪-সেপ্টেম্বর’২৫) কমপক্ষে ১০৪৭ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮০৫০ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার ও মূল্যবোধের চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর এ সকল বিষয় বাস্তবায়ন করতে না পারলে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাবে। তাই “এইচআরএসএস”র পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলসমূহ ও সরকারকে মানবাধিকার রক্ষায় ও সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে এবং দেশের সকল সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। -
