Logo
Logo
×

সংবাদ

১৭টি ভিডিওতে আন্দোলন দমনে নৃশংসতার চিত্র দেখানো হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০২:৩৫ পিএম

১৭টি ভিডিওতে আন্দোলন দমনে নৃশংসতার চিত্র দেখানো হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ পরিবেশিত হলো ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমন অভিযানের কিছু হৃদয়বিদারক চিত্র। সরাসরি বিটিভিতে সম্প্রচার হওয়া এসব ভিডিওতে দেখা গেছে, আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া, টিয়ারশেল ও গ্যাস-গান নিক্ষেপসহ সহিংসতার একের পর এক দৃশ্য।

ভিডিওচিত্রে এক নাবালক ছেলেকে মাটিতে ফেলে একাধিক পুলিশ সদস্যের লাথি, ঘুষি ও কিল মারার ঘটনাও ধরা পড়ে। আরও দেখা যায়, গুলিতে নিহত কয়েকজন আন্দোলনকারীর দেহ পুড়িয়ে ফেলার মতো নির্মমতার দৃশ্য। এই ভয়াবহ হামলার নেপথ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তার।

জুলাই-আগস্টের সেই সময়ের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর রোববার ট্রাইব্যুনালে ৫৪তম এবং মামলার শেষ সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি প্রদান শুরু করেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ পরিচালনা করছে।

সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর তার জব্দ করা ভিডিও উপস্থাপন করেন। বেলা সোয়া ১২টা থেকে বিটিভিতে এই ভিডিওগুলো সম্প্রচার করা হয়। ভিডিওতে ফুটে ওঠে আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার কিছু অপ্রকাশিত ও নৃশংস দৃশ্য।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই সময়কার অভিযান সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আরেকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধেই দায়ের করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলা।

মামলার আগের দিনের শুনানিতে (২৪ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন তদন্ত দলের বিশেষ সদস্য ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি তার জবানবন্দিতে জানান, তদন্তকালে তিনি শেখ হাসিনার ৬৯টি অডিও ক্লিপ, তিনটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) সংগ্রহ করেন।

তিনি পাঁচটি অডিও কথোপকথনসহ তিনটি সিডি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন, যেখানে সহিংসতা ও দমন-পীড়নের নির্দেশনার ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। পরে আদালতের অনুমতিতে সেসব ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়।

জেরার সময় আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন তানভীর জোহার কাছে একাধিক প্রশ্ন রাখেন, বিশেষ করে ফোনালাপের প্রামাণিকতা, সূত্র এবং সংগ্রহ পদ্ধতি নিয়ে।

আদালতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে পুরো তদন্তের চিত্র ফুটে উঠছে। এখন মামলার শুনানি ও যুক্তিতর্কের পর্যায়ে যাবে ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনাল সূত্র বলছে, জবানবন্দি ও উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিচারিক প্যানেল মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করবেন। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর পৈশাচিক দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল’, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষ এসব অভিযোগ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘নির্জলা মিথ্যা’ বলে দাবি করে আসছে। তাদের আইনজীবীরা বলছেন, এ মামলার বিচার প্রক্রিয়া একটি রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতার অংশ।

তবে তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, যেসব ভিডিও, অডিও এবং অন্যান্য আলামত উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ সংক্রান্ত মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালেই ট্রাইব্যুনাল কক্ষে এবং বাইরে উপস্থিত ছিলেন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা।

আন্দোলনের সময় নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বিচারের দাবি জানানো হচ্ছিল। এখন তারা আশা করছেন, আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন এবং সুবিচার নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, এই মামলার মধ্য দিয়ে আন্দোলন দমনের নামে রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি নৃশংস অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে। তাঁরা মনে করেন, এ মামলার রায় শুধু বিচার নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা বহন করবে।

সাক্ষ্যগ্রহণের এই পর্যায় শেষ হলে, শিগগিরই যুক্তিতর্ক শুরু হবে বলে জানা গেছে। এরপরই রায় ঘোষণার দিকে এগোবে বহু প্রত্যাশিত এই মামলাটি।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন