জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন— কেমন করে একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সরকার দেশকে ফিরিয়ে আনছে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর স্বচ্ছতার পথে।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর পাশাপাশি জনগণের চাওয়া মেনে সংস্কার কর্মসূচি চলছে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে।
ভাষণের শুরুতেই ইউনূস ফিরে যান ১৯৭১-এ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্পে। এরপর টেনে আনলেন চলতি সময়ের কথা— ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন কীভাবে এক সময় রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে, যার ফলে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। চৌদ্দ শতাধিক প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই পরিবর্তনের পর এখন গড়ে উঠছে এক নতুন বাংলাদেশ।
একটি ন্যায্য, মানবিক, স্বপ্নময় রাষ্ট্রের খসড়া আঁকা হচ্ছে আজ। ইউনূস বলেন— “নির্বাহী আদেশ দিয়ে হুকুম জারি না করে আমরা বেছে নিয়েছি কঠিন পথ— জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কারকে টেকসই করার পথ।” এজন্য ১১টি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়েছে। একে একে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’।
এখন রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে সব দল একসাথে সংস্কারের শপথ নিয়েছে ‘জুলাই ঘোষণা’র মাধ্যমে। যাতে আগামী নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসুক, এই সংস্কারের পথ আর পেছনে না ফেরে।
অর্থনীতির দুরবস্থা ও দুর্নীতির বিস্তৃতি তুলে ধরে ইউনূস বলেন, “আমরা একে একে আবিষ্কার করেছি কিভাবে জনগণের সম্পদ গায়েব হয়ে গেছে। জনগণের পয়সায় প্রকল্প হলেও, তাতে ছিল না তাদের স্বার্থের প্রতিফলন।” এজন্য বাজারভিত্তিক মুদ্রাবিনিময় হার চালু করা হয়েছে, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার হয়েছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি সামাজিক উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউনূস বললেন, “শুধু টেকনোলজি নয়, দরকার এমন চিন্তা যা তরুণদের নিরাপদ রাখবে, আত্মনির্ভর করে তুলবে।” তাই সরকার এখন তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
জলবায়ু সংকটের কথাও উঠে আসে তাঁর ভাষণে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যেন প্রতিশ্রুত সহায়তা পায়— সেই দাবি তোলেন ইউনূস। বলেন, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ পূর্ণভাবে চালু করতে হবে।
পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত বাস্তবতা তুলে ধরে ইউনূস বলেন, “গাজায় যা ঘটছে, তা এক নির্মম গণহত্যা। শিশুদের হত্যা, হাসপাতাল ধ্বংস— এগুলোর বিরুদ্ধে আমরা যদি আজ না দাঁড়াই, আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।” তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনই পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ১৯৬৭ সালের সীমা রেখা মেনে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সরব ছিলেন তিনি। বিশ্বকে মনে করিয়ে দেন— এটি কেবল বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিষয় নয়, এটি এক আঞ্চলিক সংকট, যা সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় হতে হবে।
সব শেষে ইউনূস তুলে ধরেন তাঁর ‘তিন শূন্য’-এর স্বপ্ন। বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে শূন্য কার্বন, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ এবং শূন্য বেকারত্বের ভিত্তিতে।” এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি তাঁর বক্তৃতার শেষ করেন— শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু গভীর প্রত্যয়ে।

