Logo
Logo
×

সংবাদ

উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭, চিকিৎসাধীন আরও ৭৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৫, ১১:৪৯ এএম

উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭, চিকিৎসাধীন আরও ৭৮

আজ মঙ্গলবার সকাল আটটার পর রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী চিকিৎসক মো. সায়েদুর রহমান ব্রিফ করেন। ছবি: দীপু সংগৃহীত

ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির। সোমবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু শিক্ষার্থী, একজন পাইলট এবং একজন শিক্ষিকা। এছাড়া এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ৭৮ জন।

আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. মো. সায়েদুর রহমান জানান, বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি ৪২ জনের মধ্যে অনেকেই আইসিইউ ও এইচডিইউতে আছেন, যাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি রয়েছে ২৮ জন, এবং সেখানে পাওয়া গেছে ১৫টি মরদেহ। ঢাকা মেডিকেল কলেজে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে দুইজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। ইউনাইটেড হাসপাতালে একজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। তিনি আরও জানান, ছয়টি মরদেহ এখনও শনাক্ত করা যায়নি, যেগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ২০টি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার দিন দুপুর ১টা ৬ মিনিটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি চীনা তৈরি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের উপর বিধ্বস্ত হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ধরে যায় ভবনে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, এবং দেখা দেয় প্রাণপণ আর্তনাদ, কান্না ও বিভ্রান্তি। ঘটনার সময় স্কুল ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল, যাঁদের অধিকাংশই ছোট শিশু।

বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় সিএমএইচে ভর্তি করা হলেও শেষপর্যন্ত তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পাবনা ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন এবং এক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সায়েদুর রহমান জানান, বার্ন ইনস্টিটিউটের রোগীদের মধ্যে কয়েকজন ভেন্টিলেটরে আছেন এবং চিকিৎসক দল সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কেস সামারি পাঠানো হয়েছে এবং সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত বাংলাদেশের হাই কমিশনার বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতির উন্নয়নে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আজকের দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে নিহত শিশুদের প্রতি। দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে আজকের (২২ জুলাই ২০২৫) এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় না করতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ডা. সায়েদুর রহমান জানান, আহতদের রক্তের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হলেও কিছু নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হতে পারে। সুশৃঙ্খলভাবে সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হয়। হাসপাতালের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, এবং সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। বার্ন ইনস্টিটিউটে কেউ প্রবেশ করতে চাইলে অবশ্যই পরিচয়পত্র ও প্রমাণ সঙ্গে রাখতে হচ্ছে।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো দেশ। যারা শুধু বই হাতে স্কুলে গিয়েছিল, সেই নিষ্পাপ মুখগুলোর আর ঘরে ফেরা হলো না। এই শোক কখনোই মুছে যাওয়ার নয়। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়নের ভেতরে থেকেও এ ধরনের দুর্ঘটনা জাতিকে একবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—শিশুদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মান ও জরুরি সঙ্কট ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন