আল জাজিরা প্রতিবেদন
বাংলাদেশে হাসিনার পতনে র্যাপ আর মিমের ভূমিকা— এবার রাজনীতির রূপ বদলাচ্ছে সেগুলোই
মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৫, ১২:৫৯ পিএম
র্যাপার শেজান (বাঁয়ে) ও হান্নান শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি সংগীত আয়োজনের আগে। ছবি: মাসুম বিল্লাহ/আল জাজিরা
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনে তরুণদের যে ভূমিকা ছিল, সেই ভূমিকা শুধু রাজপথে নয়, ছড়িয়ে পড়ে গানের শব্দে, মিমের ব্যঙ্গচিত্রে আর দেয়াল লিখনে। এখন সেই একই ভাষা, একই কণ্ঠ, একই প্রতিরোধ দেশের নতুন শাসকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করছে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, যখন নিরাপত্তা বাহিনী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষদের ওপর নির্মম হামলা চালায়, তখনই র্যাপার মাসরুর জাহান আলিফ, যিনি 'শেজান' নামে পরিচিত, একটি গান প্রকাশ করেন— 'কথা কও'। গানটিতে প্রশ্ন ছিল, “দেশ বলে স্বাধীন, তবে গর্জন কই?”
সেদিনই আন্দোলনকারী আবু সায়েদের মৃত্যু ঘটে, যিনি পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর মৃত্যু মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে, আর 'কথা কও' এবং আরেক র্যাপার হান্নান হোসেন শিমুলের গান সেই আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ আসে আগস্ট মাসে, যখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে চলে যান।
এক বছর পরে, শেজান নতুন একটি র্যাপ গান বের করেন, ‘হুদাই হতাশে’। সেখানে তিনি বলেন, “চোররে ফুল দিয়া বরণ কইরা নেয়”— ইঙ্গিত সেইসব লোকের প্রতি, যারা যোগ্যতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেছে।
এই প্রতিবাদ কেবল তখনকার ছিল না, তা এখনো চলছে। মিম, র্যাপ, দেয়ালচিত্র এখন তরুণদের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তখন যেমন হাসিনার সরকারকে টেনে নামাতে এই মাধ্যমগুলো কাজে লেগেছিল, এখন তেমনি নতুন সরকারের জবাবদিহি আদায়ের মাধ্যমেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি ভাইরাল মিম ছিল বাংলাদেশের সরকারি লোগোর ব্যঙ্গচিত্র। সেখানে লাল-সবুজ সীলের মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্রের বদলে দেখা যায় লাঠি হাতে লোকজন একজন মানুষকে পেটাচ্ছে। সেখানে লেখা ছিল, "গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার" নয়, “গণতান্ত্রিক মারদাঙ্গা সরকার”। এই মিম তৈরি করেছিলেন সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্ট ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, “এই ব্যঙ্গচিত্র বানাই হতাশা থেকে। মানুষ শেয়ার করেছে, কেউ কেউ প্রোফাইল পিকচারও দিয়েছে। এটি ছিল নীরব প্রতিবাদ।”
ছাত্র-জনতার বিদ্রোহের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার আসে, তারা নতুন করে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, সংবিধান ও পুলিশের সংস্কারে হাত দেয়। কিন্তু জনরোষ ও দলে দলে হিংসাত্মক প্রতিশোধের ঢেউ তারা সামাল দিতে পারেনি। কোনো কোনো গোষ্ঠী সুফি মাজার, হিন্দু সংখ্যালঘুদের মন্দিরে হামলা করে। এমনকি খেলোয়াড়ী মাঠেও হানা দেয়। কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের মেরে ফেলা হয়, যেগুলোর অনেক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ইমরান হোসেন বলেন, “অনেক গোষ্ঠী, যারা আগের শাসনকালে নিপীড়িত ছিল, তারাই এখন হঠাৎ ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।”
র্যাপ গান ও মিম যেমন আগে প্রতিবাদের ভাষা হয়েছিল, হাসিনার পতনের পর সেগুলো আরো তীব্র রূপ নেয়। ১৮ ও ১৯ জুলাই যখন নিরাপত্তা বাহিনী শত শত মানুষ হত্যা করে, তখন শেখ হাসিনাকে দেখা যায়, একটি মেট্রো স্টেশনের ক্ষতি দেখে কাঁদছেন। এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর ব্যঙ্গের জন্ম দেয়। একটি মিম ভাইরাল হয়— “নাটক কম করো প্রিয়।” এতে হাসিনার কান্নাকে ব্যঙ্গ করা হয়, কারণ যে মুহূর্তে শত শত মানুষ প্রাণ হারায়, সে সময় নেত্রীর এই আবেগ অনেককে মনে করিয়ে দেয় শূন্যতার অভিনয়।
রাজনৈতিক মিমকার পুনি কবীর বলেন, “আগে হাসিনাকে নিয়ে মিম করা কঠিন ছিল। ২০০৯ সাল থেকে সমালোচকরা গ্রেপ্তার, গুম বা সেন্সরশিপের শিকার হতো। আমরা ভয় ভেঙে দিয়েছি।”
হাজার হাজার দেয়ালে তখন লেখা হয় “কিলার হাসিনা”, “গণহত্যা বন্ধ করো”, “তোমার সময় শেষ হাসিনা”। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অলতাফ পারভেজ বলেন, “একটা স্লোগান সব বদলে দিতে পারে। যেমন: 'ভয় পেলে শেষ, প্রতিরোধে বাংলাদেশ'। সৃজনশীল প্রতিবাদ মানুষের মধ্যে সাহসের আগুন জ্বালায়।”
এই প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। এখন নানা রাজনৈতিক দল ও নেতার বিরুদ্ধেও মিম তৈরি হচ্ছে। ইমরান হোসেনের আরেকটি কাজ 'দ্য সিম্পসনস' কার্টুনের মাধ্যমে বোঝায় কিভাবে একসময় শেখ হাসিনার পরিবারের প্রশংসা করা হত মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য। এখন বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের পরিবারকেও ঠিক তেমনভাবে গৌরব দেওয়া হচ্ছে।
একটি জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ উইট্টিজেনজির একটি মিমে এনসিপি-র এক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
শিল্প এখন কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালে নতুন টাকায় ছাত্রদের আঁকা দেয়ালচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত নকশা প্রকাশ করে। এতে বোঝা যায়, শিল্প রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক শাফকত রাব্বী বলেন, “বাংলাদেশে মিম ও ছবির কার্ড ঠিক পশ্চিমাদের টুইট বা এক্স পোস্টের মতো কাজ করে। এগুলো সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক মন্তব্য— কিন্তু ভাইরাল হওয়ায় সবচেয়ে কার্যকর।”
শেজান বলেন, “আমি নিজেই ‘কথা কও’ এর গান লিখেছিলাম। ভাবিনি এমন প্রতিক্রিয়া পাব। যা ঘটছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় দায়বোধ থেকেই লেখা।”
হান্নান হোসেনের গান 'আওয়াজ ওঠা'ও ১৮ জুলাই ফেসবুকে ভাইরাল হয়। গানের একটি লাইনে বলা হয়, “একজনরে মারবা, দশজন আসবে ফিরে।” হাসিনা পরে দেখেছেন, তা-ই হয়েছে। হান্নানকে গান প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তিনি ছাড়া পান হাসিনার দেশত্যাগের পর।
শেজান এখন বলেন, “র্যাপ আর শুধু গান নয়, এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ। বিজ্ঞাপন থেকে জীবনের প্রতিটি খাতে হিপ-হপ ঢুকে গেছে। মানুষ সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে এই সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছে।”
তিনি বিশ্বাস করেন, “র্যাপের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।”
