Logo
Logo
×

সংবাদ

সচিবালয়ের ভেতরে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে কর্মচারীদের প্রতিবাদ সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৫, ০১:৩০ পিএম

সচিবালয়ের ভেতরে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে কর্মচারীদের প্রতিবাদ সমাবেশ

সরকারি চাকরির বিধি সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারি করায় অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রশাসনিক ভবন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। পুরো এলাকা রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে।

মঙ্গলবার, টানা চতুর্থ দিনের মতো চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে সচিবালয়ের প্রধান প্রবেশপথে এলিট ফোর্স সোয়াট মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিন সাধারণ দর্শনার্থীদের সচিবালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়, যার ফলে দুপুর পর্যন্ত সাংবাদিকদেরও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থানরত কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব নির্ধারিত আন্দোলন পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সকাল থেকেই স্লোগান ও মিছিল করছেন এবং পরে নতুন ভবনের নিচে সমবেত হয়ে অবস্থান নিয়েছেন।

এ সময় বিএনপি-সমর্থিত ‘বৈষম্য প্রতিরোধ কর্মচারী ঐক্য জোট’-এর সভাপতি এ বি এম আব্দুস সাত্তার গাড়িযোগে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে গেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরা তাকে ফিরিয়ে দেন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা একপেশে ও কঠোর আইন বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ করছেন। আমাদের জোটের পক্ষ থেকে সংহতি জানিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারের শীর্ষ মহল আমার প্রবেশে বাধা দিয়েছে। আমি নিজে সরাসরি কোনো আন্দোলনে অংশ নেইনি, কেবল নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। সরকার যে প্রকার আইন করছে, তা এর আগেও ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো পর্যন্ত করেনি।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি দপ্তরের উপরের স্তরে এখনো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবাধীন কর্মকর্তারা বসে আছেন, অথচ তাদের থাকার ন্যায্যতা নেই। তাদের উদ্দেশ্য সরকারকে বিপদে ফেলা এবং প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। তারা এমন আইন তৈরি করছে যার মাধ্যমে যেকোনো কর্মচারীকে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই চাকরি থেকে বাদ দেওয়া যাবে।”

এই বিক্ষোভের আয়োজক ‘বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ’। এই সংগঠনের এক কর্মী জানান, তারা সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

তিনি আরও বলেন, “আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে চিত্র ও ভিডিও প্রেরণ করবো।”

অন্যদিকে, সোমবার মধ্যরাত থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের উল্টো পাশে ফুটপাথে একটি সংগঠন ‘জুলাই মঞ্চ’ “প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে দূর্ণীতিগ্রস্ত ও স্বৈরতান্ত্রিক আমলাদের অপসারণ” দাবিতে একটি কর্মসূচি শুরু করেছে যার নাম – ‘ফ্যাসিবাদ উৎখাতযাত্রা’।

যদিও সচিবালয় চত্বর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে, তারপরও প্রতিবাদকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। ‘জুলাই মঞ্চ’ একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে তারা আওয়ামী লীগপন্থী ৪৪ জন আমলার নাম ও ছবি দিয়ে তাদের বহিষ্কারের দাবি তুলেছে।

এক পর্যায়ে সংগঠনের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম তালুকদার, মুখপাত্র সাকিব হোসাইন ও প্রধান সংগঠক অর্নব হোসাইনকে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায়। প্রতিবাদী দুই নারী কর্মী তাসমিয়া রহমান ও সুরাইয়া আন্তাও আলোচনায় অংশ নিলে বাকি সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয়, কোনো মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার না করেই কর্মসূচি চালানো হবে।

আরিফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “আমলারা গতকাল আন্দোলনে নেমেছে দেখে আমরা এখানে বসেছি, বিষয়টা এমন নয়। আমরা ফেব্রুয়ারি থেকেই এসব দাবিতে কর্মসূচি দিয়ে আসছি। শুক্রবার দেওয়া চূড়ান্ত আল্টিমেটামের ভিত্তিতে আমরা এখানে অবস্থান নিয়েছি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যদি ফ্যাসিস্ট আমলাদের অপসারণে সুস্পষ্ট রূপরেখা না দেন, তাহলে আমরা এখানেই থাকবো। আমাদের ১৪৪ ধারা বা ২৮৮ ধারার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না।”

বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদ সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ প্রণয়নের অনুমোদন দেয়।

এর বিরোধিতায় শনিবার সকাল থেকেই সচিবালয়ের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ দেখান প্রশাসনিক কর্মচারীরা।

তাদের প্রতিবাদের মাঝেই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন শেষে রোববার রাতে সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এই সংশোধনীতে ‘৩৭ক’ নামক একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।

এই নতুন ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণ করেন, সহকর্মীদের মধ্যে বিদ্রোহ উসকে দেন, কর্মস্থলে ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা অন্যকে বাধ্য করেন কর্মবিরতিতে—তবে তা হবে দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই অপরাধের সাজা হিসেবে বেতন কাঠামোতে অবনতি, চাকরি থেকে সাময়িক বা স্থায়ী বরখাস্তের বিধান রাখা হয়েছে।

এইসব শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গঠন করে সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলবে, জবাব না পেলে আরও সাত দিনের সময় দিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে, অভিযুক্ত কর্মচারীদের রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে—সাজা কার্যকর হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে।

এই নতুন অধ্যাদেশকে আন্দোলনকারীরা ‘অগণতান্ত্রিক এবং দমনমূলক কালো আইন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এই আইন করেছে, এবং সেটি সময়োপযোগী মনে করছে।”

অন্যদিকে কর্মচারী পরিষদের নেতা মোজাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, “জনপ্রশাসন সচিব গোপনে আইন মন্ত্রণালয়ে বসে এই অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করেছেন। উপদেষ্টারা আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা রক্ষা করেননি।”


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন