Logo
Logo
×

সংবাদ

সিকদারের দুই ছেলের বেসামাল চলাফেরা

Icon

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৫৩ এএম

সিকদারের দুই ছেলের বেসামাল চলাফেরা

ধুঁকতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে বাঁচাতে দুই পরিচালক রণ হক সিকদার ও রিক হক সিকদারকে বাদ দিয়েই পরিচালনা পর্ষদ পুর্নগঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রণ হক সিকদার ও রিক হক সিকদার ২০২১ সালের ১০ ফেব্রয়ারি প্রয়াত সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক শিকদারের ছেলে। জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর পারিবারিক দ্বন্দ, ক্ষমতার দ্বন্দ, অর্থলোভ, দুই ভাই রণ হক শিকদার ও রিক হক শিকদারের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, বোন নাসিম হক শিকদারকে তার অধীকার বঞ্চিত করার মনোভাব ন্যাশনাল ব্যাংককে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দেয়। 

এছাড়াও এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঋণ না দেওয়ার কারণে হুমকি দিয়েছিল দুই ভাই । এক্সিম ব্যাংক এ বিষয়ে   মামলাও করেছিল ন্যাশানাল ব্যাংকের এই দুই পরিচালকের বিরুদ্বে। এরপর করোনার অতিমারির মধ্যেই ভাড়া করা বিমানে ঢাকা ত্যাগ করে দুই ভাই ।

আইন অমান্য করে ব্যাংকের পরিচালক রণ হক শিকদার ও রিক হক শিকদারকে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নজীরবিহীন পরিমান ঋণ দেয়ার অভিযোগ নিয়ে ২০২১ সালেই  তদন্ত শুরু করে দুদক। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ক্ষমা চায়।  ২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘এ ধরণের অন্যায় ভবিষ্যতে আর হবে না। ব্যাংকিং আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করে ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের ২ পরিচালক রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার এবং তাদের পরিবারের দস্যসহ মোট ১১ জনকে ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ১৩ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১১৮ কোটি টাকা) খরচ করার সুবিধা দেয়।

একই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের কার্ড বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তখন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলো যেন তাদের কার্ড সেবা বন্ধ করে না দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শাস্তিস্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাসে ১১ জন গ্রাহকের ঋণ সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৫৫ লাখ টাকা জরিমানাও করেছিলো।

ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির কারণে ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ সৈয়দ আবদুল বারীকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তাঁকে ব্যাংকের অন্যতম মালিক সিকদার পরিবারের কয়েকজন সদস্য পদত্যাগে বাধ্য করেন বলে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। এর নেপথ্যে ছিল ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সিকদার পরিবারের সদস্যদের অর্থ খরচ করার তথ্য গোপন রাখার ঘটনা।

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ছাড়াও দুই ভাই আলোচনায় আসেন ২০২০ সালের মে মাসে বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডিকে অপহরণের পর গুলি করে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে।

ঘটনার বর্ণনায় এজাহারে উল্লেখ রয়েছে- রন হক সিকদার ২০২০ সালের ৭ মে সকালে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডিসহ গুলশানে এক্সিম ব্যাংকে আসেন। তারা তাদের প্রস্তাবিত ঋণের টাকার বিপরীতে ‘কোলেটারেল’ হিসেবে সিকদার গ্রুপের রূপগঞ্জের কাঞ্চন এলাকায় প্রস্তাবিত আদি নওয়াব আসকারী জুট মিলটি পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যান এক্সিম ব্যাংকের এমডি হায়দার আলী ও অতিরিক্ত এমডি ফিরোজকে। ওই স্থানটি দেখে তার বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে গ্রাহকের বন্ধকী মূল্যের বিশাল ব্যবধান হওয়ায় দ্বিমত পোষণ করেন এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডি। এরপর রন হক সিকদার পূর্বাচলে অবস্থিত তাদের অন্য প্রকল্প স্যাটেলাইট সিটিতে আইকন টাওয়ারের জায়গাটি পরিদর্শনের জন্য বলেন। কিন্তু ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংকের জরুরি সভা থাকায় পূর্বাচলে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকার উদ্দেশ্যে ফেরার পথে তিনশ ফিট রাস্তায় উঠার পর রন হক সিকদার ও এনবিএলের এমডিকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামান তারা।  এ সময় এনবিএলের এমডি গাড়ি থেকে নেমে এসে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডিকে বলেন যে রন হক সিকদারের দেওয়া নির্ধারিত স্থানে আপনারা উপস্থিত হতে ব্যর্থ হওয়ায় অত্যন্ত মনক্ষুন্ন ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সেখানেই রন হক সিকদার এক্সিম ব্যাংকর দুই নির্বাহীকে তার নিকট মাফ চাইতে বাধ্য করেন। তখন রন হক সিকদার গাড়ির ভিতর থেকে বসা অবস্থায় জানালার গ্লাস নামিয়ে তার পিস্তল বের করে হত্যার উদ্দেশ্যে এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে লক্ষ্য করে গুলি করেন, যা এমডির বাম কানের পাশ দিয়ে যায়। এসময় এমডি হতভম্ব হয়ে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকেন। পুনরায় এএমডিকে লক্ষ্য করে গুলি করতে উদ্যত হলে তিনি দৌড় দিয়ে গাড়ির পেছনে আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, এরপর রন হক সিকদার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডি এবং অতিরিক্ত এমডিকে গাড়িতে তুলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বনানী ১১ নম্বর সড়কের সিকদার হাউজে নিয়ে যান। সেখানে রন ও রিক জমির দাম কম বলায় এক্সিম ব্যাংকের এএমডি ফিরোজকে মারতে উদ্যত হলে তিনি মাফ চেয়ে প্রাণে বাঁচেন। দীপু সিকদার তৃতীয় তলায় এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে মারতে মারতে নিচে নামার সময় এমডির পক্ষে এএমডি মাফ চান এবং তাকে না মারার অনুরোধ করেন। এরপর রন হক সিকদার ও দিপু সিকদার এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে প্রকল্পের সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী আছে ব্যক্ত করে তাদের সাথে থাকা অস্ত্র তাক করে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়। এরপর বিকালে দিপু হক সিকদারের নির্দেশে তাদের বাবা জয়নাল হক সিকদারের কাছে এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে ফটোসেশন করানো হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর মরণ ব্যাধি করোনার মধ্যে চাটার্ড প্ল্যানে ঢাকা ত্যাগ করে দুই ভাই ।

উল্লেখ্য ন্যাশনাল ব্যাংক ১৯৮৪ সালে পুজিবাজারে তালিকুভুক্ত হয়। দেশের প্রথমদিককার এই ব্যাংকটি ৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা পরিশোধিত মুলধন নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন