চালের বাজারে নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের, করপোরেট থাবায় দিশেহারা ভোক্তা
ছবি: সংগৃহীত
দেশের উত্তর-পূর্ব জেলাগুলোর বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এবং দক্ষিণ অঞ্চলের বোরো ধান কৃষকের ঘরে উঠে গেছে। এখন চলছে উত্তরের বোর ধান কাটার মৌসুম। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, আরও দিন পনেরো পরেই শেষ হবে তাদের ব্যস্ততা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবারের বোরো মৌসুমটা ভালো ভাবেই শেষ হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, চলতি মৌসুমে সারাদেশে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর চাল উৎপাদন হবে দুই কোটি ২২ লাখ টন। ১৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য আপাতত এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলেও, খাদ্যের অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন খোদ কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুস শহীদ।
এদিকে, আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনের পরও চালের দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। গত ৭ জানুয়ারির ভোটের পরপরই চালের দাম কেজিতে অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা মিলগেটেই বেড়ে যায়। এরপর প্রশাসনের অভিযানে এক-দুই টাকা কমলেও তারপর একই অবস্থায় রয়েছে।
এক্ষেত্রে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই ভাত খান। ফলে সিন্ডিকেটের কাছে এটি সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক পণ্য। এখন বড় বড় শিল্পগ্রুপগুলোও এ খাতে বিনিয়োগ করছে। মৌসুমের শুরুতে তারা বিশাল অংকের টাকা ছড়িয়ে বিপুল পরিমাণে ধান কিনে গুদামজাত করছে। এ কারণে সুগন্ধি চাল থেকে খাবার চালও এখন প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে আসছে। বাজারে চালের দাম বাড়ার এটাও একটি কারণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বড় বড় চালকল মালিকদের অসাধুচক্রের সঙ্গে ৫ থেকে ৬টি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও যোগ দিয়ে বাজার অস্থির করে তুলেছে। এসব কোম্পানিগুলো প্রায় শতভাগ নিত্যপণ্যের মালিক। ফলে সরকার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।
৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের প্রথম বিষয় ছিলো দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটি হয়নি।
ওই নির্বাচনের পরপরই চালভেদে কেজিতে ৫-৬ টাকা বেড়েছে। এরপর থেকে দামের লাগাম টানতে ঢাকাসহ সারাদেশে মজুতবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয় ৪৮-৫৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এই চাল ৫০-৫৪ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝারি মানের চাল ৫৫-৬০ টাকা। আর সরু চাল ছিল ৬০-৭৫ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগেও একই দাম ছিল।
যা বলছেন কৃষকরা
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক ফনি ভূষণ রায়। তিন একর আবাদি জমিতে ধান চাষ করেন। বোরো ও আমন মিলিয়ে যে ধান হয় খাবার খরচ বাদে প্রায় ২০০ মন ধান বিক্রি করেন তিনি। তবে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় লাভ তেমন থাকে না বলে জানান তিনি। তার দেওয়া হিসাব মতে এক কাঠা (১০ শতাংশ) জমি আবাদ করতে ৬০ টাকার বীজ ধান লাগে, আবাদে খরচ হয় ৫০০ টাকা, ধান রোপণে ৫০০ টাকা, পানি দিতে খরচ ৬০০ টাকা, নিড়ানি ৩০০ টাকা, ডিএপি সার প্রতি কাঠায় ৫ কেজি করে ১২৫ টাকা, এমওপি সার প্রতি কাঠায় তিন কেজি করে ৭৫ টাকা, ইউরিয়া ৫ কেজি করে ১৫০ টাকা, বালাই নাশক ২০০ টাকা, ধান কাটা এক হাজার টাকা, ধান মাড়াই ৩০০ টাকা। এছাড়া পাঁচ মাস একজন মানুষকে শ্রম দিতে হয়।
নিজস্ব শ্রম ছাড়া এক কাঠা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় চার হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে প্রতি কাঠায় ধান পাওয়া যায় ৭-৮ মণ। উৎপাদিত মোটা-চিকন ধান তারা মাড়াইয়ের পর বাড়ি থেকে বিক্রি করেন সর্বোচ্চ ৭০০-৮০০ টাকা মণ। এতে প্রতি কাঠায় কৃষকের লাভ হচ্ছে প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
একই ধরনের হিসাব দিলেন পিরোজপুরের কৃষক সুমন শেখ। তার মতে ধান উৎপাদনের পরে তার দাম পান না। অথচ বাজারে চালের দাম চড়া। এটা কিভাবে হয়, কারা করে-এমন প্রশ্ন সুমনের।
বৃহস্পতিবার দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরের তেঁতুলতলা মোড়ের একটি মুদি দোকানে খোলা ও প্যাকেটজাত চাল পাশাপাশি দেখা যায়। দোকানি জানালেন, খোলা চাল মিলগুলো থেকে আসে। আর প্যাকেটজাত চাল বিভিন্ন কোম্পানির।
খোলা চালের চেয়ে প্যাকেটজাত চালের দামে কেজিতে ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে বলে জানালেন ওই দোকানি। তবে পোলাও বা সুগন্ধি চালের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বেশি।
করপোরেটের থাবায় অস্থির চালের বাজার
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার বারবারই করপোরেট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসছে। সম্প্রতি সিটি গ্রুপ, স্কয়ার, প্রাণ আরএফএল, মেঘনা গ্রুপ, এসিআই, আকিজ এসেনশিয়ালসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় বসেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।
ওই বৈঠকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার থেকে অতিরিক্ত ধান কেনা থেকে বিরত থাকতে বলেন মন্ত্রী। কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হয়েছে বলে মনে করছেন না মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, দেশের ৫০-৫৫টি বড় অটো রাইস মিল ও ৫-৬টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে নির্বাচনের পরপরই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এদেরকে দমন করা না গেলে চালের বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর থাবা দিনকে দিন বড় হচ্ছে উল্লেখ করে সফিকুজ্জামান বলেন, বর্তমানে তারা মোট চালের চাহিদার ১০ শতাংশের মতো জোগান দেয়। তবে সামনের দিনগুলোয় তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে এতে সন্দেহ নেই।

