নরসিংদীতে আ.লীগ সন্ত্রাসীদের ভয়ে গ্রাম ছাড়া বিএনপির ৩শ’ নেতাকর্মী
ছবি: সংগৃহীত
নরসিংদীর সদর উপজেলার চরাঞ্চল আলোকবালিতে চলমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দাপটে বিএনপির প্রায় তিনশতাধিক নেতাকর্মী গ্রাম ছাড়া হয়ে পড়েছেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও আওয়ামী চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে বিএনপির এসব নেতাকর্মী গ্রাম ছাড়া হয়ে পড়েছে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, আলোকবালী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়কসহ ৩ জনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী প্রকাশ্যে এলাকায় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে মহাড়া দিচ্ছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এদিকে, সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করতে প্রতিদিন ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। ফলে ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের এক সংবাদে বলা হয়, শেখ হাসিনা পালানোর পর সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী গা ঢাকা দিলেও নরসিংদীর আলোকবালী আওয়ামী লীগ সভাপতি আসাদ বাহিনী ও আওয়ামী চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দীপু বাহিনীর তান্ডব এখনো কমেনি। গত কয়েকদিনে আসাদ বাহিনী ও দীপু বাহিনীর হাতে বিএনপির দুই জনসহ ৩ জনকে প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন করলেও মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
জানা যায়, নরসিংদী সদর উপজেলা মেঘনা নদী বেষ্টিত দুর্ঘম চরাঞ্চল আলোকবালী। এ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ আসাদ এবং সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দীপু। তিনি সদর আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম হিরুর সমর্থক। এছাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ আসাদ নরসিংদী শহরের সন্ত্রাসীদের গড ফাদার ও সাবেক পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলোর সমর্থক। ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে আসাদ ও দীপু মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শতকোটি টাকা কামিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত বছরের জুলাই-আগষ্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফ্যাসিষ্ট হাসিনা পালিয়ে যায়। ওই সময় আসাদ ও দীপু বাহিনী গা ঢাকা দেয়। গত মাসের ১৮ সেপ্টম্বর ভোরে আসাদ ও দীপু বাহিনী কয়েক শত সন্ত্রাসী প্রাকাশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আলোকবালী ইউনিয়নের মুরাদনগর গ্রামে অবস্থান নেয়। ওই সময় তারা গ্রামবাসী ও বিএনপির নেতাকর্মীর ওপর এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ করে। ওই সময় ইদন মিয়া নামে এক বিএনপি কর্মীকে প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করে তারা এলাকায় অবস্থান নেয়। এরপর দিন ফেরদৌসী নামে এক নারীকে গুলি করে হত্যা করে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১০ দিনের মাথায় ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাদেক মিয়াকে স্থানীয় বাজারে প্রকাশে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী সন্ত্রাসী আসাদ ও দীপু সমর্থকরা। এরই পর পরই আলোকবালী, মুরাদনগর, বাখননগর ও বইস কালিপুর গ্রামে নিষিদ্ধ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি আসাদ ও আওয়ামী চেয়ারম্যান দীপুর সন্ত্রাসীরা একছত্র অবস্থান নেয়। পরে তারা এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীদের টার্গেট করে রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি হামলা করেন। এতে ভয়ে ও আতঙ্কে ওই গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী গ্রাম ছাড়া হয়ে পড়ে। বিএনপি নেতাকর্মীরা গ্রামে প্রবেশ করতে চাইলেও তারা হামলার শিকার হচ্ছে।
নিহত বিএনপি কর্মী ইদন মিয়ার ছেলে আল মামুন বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর আসাদ ও দীপু বাহিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে শক্তি সঞ্চয় করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের নিয়ে পুনরায় ১৮ সেটেম্বর গ্রামে ফিরে আসে। এসেই তারা আমার বাবাকে হত্যা করে। বিএনপি নেতাকর্মীদের দেখলেই গুলি করে হত্যা করে। এতে প্রাণ ভয়ে আমরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তাদের আইনের আওতায় না আনলে গ্রামে শান্তি ফিরবে না।
নিহত যুবদল নেতা সাদেক মিয়ার ভাই আবুল হোসেন জানান, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমার ভাইকে প্রকাশ্যে গুলি করে মারল। আবার তারাই আমাদের এলাকা ছাড়া করে রেখেছে। কেউ গ্রামে ঢুকলেই তাদের গুলি করে হত্যা করছে। সেই ভয়ে কেউ এলাকায় যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। তাই প্রশাসনের কাছে জোর দাবি এলাকার শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে কার্যক্রর ভূমিকা রাখবে।
সদর থানা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক এনামুল হাসান জানান, ফ্যাসিষ্টরা গত ১৭ বছর আমাদের নির্যাতন করেছে। ভেবে ছিলাম এখন শান্তিতে থাকতে পারব। কিন্তু না তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এলাকার পরিস্থিতি উতপ্ত করে রেখেছে। তাই বিএনপি নেতাকর্মীরা গ্রামে যেতে ভয় পায়।
নাম প্রকাশে অপর এক গ্রামবাসী জানায়, মূলত মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের জন্যই আসাদ ও দীপু বাহিনীরা এসব করে বেড়াচ্ছে। তারা ১৭ বছর নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছে। কিছুদিন শান্ত ছিল। এখন পুনরায় বালু উত্তোলন করতে অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে গ্রামগুলো দখলে নিয়েছে। তারা এর প্রতিকার চান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলোকবালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ আসাদ ও ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে নরসিংদী পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম জানান, আলোকবালীতে দাঙ্গা ও হানাহানির সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সহিংসতা বন্ধে ইতিমধ্যেই সেখানে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাছাড়া এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রসাশক, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ রাজনিতিক ও গ্রামবাসীদের নিয়ে সচেতনতামূলক মতবিনিময় ও ক্যাম্পেইন করা হচ্ছে। আশা রাখছি আলোকবালিতে সংহিংসতা কমে আসবে।
বিএনপির তিন শতাধিক নেতাকর্মী গ্রামছাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নানা বিষয়েই বিভিন্ন রকম তথ্য আমাদের কানে আসছে। আমার সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ব্যাবস্থা গ্রহণ করছি।

