আল জাজিরার বিশ্লেষণ
পাকিস্তান কেন যুদ্ধবিমান বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোয় বিক্রি করছে
আবিদ হুসেইন
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:০১ পিএম
নতুন বছরের শুরুতেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধানদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। গত ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিদ্দু ও বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের মধ্যে এই বৈঠকে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান-উৎপাদিত যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ থান্ডার কেনার সম্ভাব্য আলোচনা।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখা আইএসপিআর জানায়, এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘বয়সী বহর এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ’ নিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এই আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সুপার মুশশাক নামের প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের আশ্বাসও দেয় পাকিস্তান। সুপার মুশশাক হলো হালকা ওজনের, দুই থেকে তিন আসনের একটি প্রশিক্ষণ বিমান। এটি বর্তমানে তুরস্ক, আজারবাইজান, ইরান, ইরাকসহ দশটিরও বেশি দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
বৈঠকের ঠিক পরদিন, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তিকে যুদ্ধবিমান ক্রয়ে রূপান্তরের বিষয়ে আলোচনা করছে। এর আগেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
একই সময়ে খবর আসে, পাকিস্তান লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে চার বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যার অংশ হিসেবে ১২টির বেশি যুদ্ধবিমান বিক্রি করার কথা রয়েছে।
তবে এখনো পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে এসব চুক্তি স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত শুধু আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, কোনো চুক্তি সই হয়নি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৫ সালের কয়েকটি ঘটনায় পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
এই যুদ্ধবিমানটির দাম তুলনামূলক কম—২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার। গত এক দশকে নাইজেরিয়া, মিয়ানমার, আজারবাইজান এই বিমান কিনেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের একটি বিমান যুদ্ধ হয়। এ সময় দুই পক্ষই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, বিমানঘাঁটি ও কাশ্মীরের সীমান্ত এলাকায় হামলা হয়। পাকিস্তান দাবি করে, তারা বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। প্রথমে ভারত অস্বীকার করলেও পরে আংশিকভাবে তা মেনে নেয়।
পাকিস্তানের সাবেক এয়ার কমোডোর আদিল সুলতান বলেন, ‘জেএফ-১৭ অনেক বেশি দামের পশ্চিমা বা রুশ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। ফলে এটি এখন অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’
জেএফ-১৭ তৈরি করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন। ১৯৯০-এর শেষদিকে এর যৌথ উন্নয়ন শুরু হয় এবং ২০০৭ সালে এটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হয়।
এর উৎপাদন ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে হয়। ফ্রন্ট ফিউজলাজ ও টেইল পাকিস্তান তৈরি করে, আর মাঝের অংশ তৈরি করে চীন। এতে রাশিয়ান ইঞ্জিন ও ব্রিটিশ মার্টিন বেকারের সিট ব্যবহার হয়। তবে পুরো অ্যাসেম্বলির কাজ হয় পাকিস্তানে।
২০২০ সালে এর সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ ব্লক-৩ চালু হয়। এটি এখন ৪.৫ জেনারেশনের ফাইটার জেট হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে আছে এইএসএ রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষমতা।
জেএফ-১৭ এমন একটি যুদ্ধবিমান, যা মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় উচ্চ গতির চমৎকার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রাখে এবং কম দামে কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা দেয়।
এখন পর্যন্ত মিয়ানমার এই বিমান ১৬টি অর্ডার করেছে, যার মধ্যে ৭টি পেয়েছে। নাইজেরিয়া তিনটি বিমান যুক্ত করেছে তাদের বহরে। আজারবাইজান ২০২৪ সালে ১৬টি অর্ডার করে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাঁচটি বিমান বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে প্রদর্শন করে।
যদিও চীন এই বিমান ব্যবহার করে না, কারণ তারা নিজেদের তৈরি জে-১০, জে-২০ এবং উন্নত জে-৩৫ ব্যবহার করে। পাকিস্তান জেএফ-১৭-এর পুরো অ্যাসেম্বলি ও বিক্রয়োত্তর সেবা দেয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ৪.৫ জেনারেশনের এই বিমানগুলোয় চূড়ান্ত স্টিলথ প্রযুক্তি না থাকলেও বিশেষ কোটিংয়ের কারণে রাডারে ধরা কঠিন হয়। তারা ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবহার করে শত্রুর সিগন্যাল বিঘ্ন করতে পারে এবং দূর থেকে আক্রমণ করে পালাতে সক্ষম।
রাফাল বা গ্রিপেনের মতো বিমানের দাম যেখানে ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে জেএল-১৭ অনেক কম দামে কার্যকর প্যাকেজ দিচ্ছে—এই কারণে এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আকর্ষণীয়।
পাকিস্তানের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘জেএফ-১৭ হলো এমন একটি প্যাকেজ, যা যুদ্ধক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও কম দামের মাধ্যমে মোটামুটি একটি “যথেষ্ট ভালো” সমাধান দেয়।’
তবে তিনি বলেন, ‘এই বিমান উচ্চ পর্যায়ের নয়। এসব বিমানের পাল্লা, বোঝা বহনের ক্ষমতা ও উন্নত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার তুলনায় এখনও পিছিয়ে।’
সুলতান বলেন, ‘বিমানযুদ্ধ কেবল প্ল্যাটফর্মের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। পাইলটের প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও রাডার ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সরাসরি শত্রু বিমান ভূপাতিত না করলেও, এটি গঠনের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে পাকিস্তান দাবি করে, তারা এই বিমান দিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ভারত এই দাবি অস্বীকার করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান এখন যুদ্ধ-পরীক্ষিত একটি সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে জেএফ-১৭কে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যুদ্ধবিমান কেনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, এবং কেবল ‘আগ্রহ’ প্রকাশ মানেই চুক্তি নয়।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ওই বিশ্লেষক বলেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বিমান বিক্রি কেবল বাণিজ্য নয়, বরং একটি কৌশলগত সম্পর্কের সূচক।’ কারণ যুদ্ধবিমান কেনা মানে কয়েক দশকের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই কেনে, তাহলে তা শুধু অস্ত্র কেনা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কের সূচনা—যেখানে চীনকেও ভবিষ্যতের মিত্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
