Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের বিস্তার

Icon

খালেদ আবু জাহর

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৫, ১০:৩৭ এএম

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের বিস্তার

বিগত কিছু বছরে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এই সম্পর্ক শুধু কূটনীতি বা ব্যবসা নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রসার লাভ করেছে। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্য এশিয়া বা দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের কোনো দেশের নতুন চুক্তি বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের খবর আসে।

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডি পোর্টস গ্রুপ ও কাজাখস্তান রেলওয়ের যৌথ প্রকল্প GulfLink কাজ শুরু করেছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো মধ্য এশিয়ার লজিস্টিক ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে গড়ে তোলা। বছরের শুরুতে উজবেকিস্তান উপসাগরীয় দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা চালু করেছে। রাজনৈতিক দিক থেকেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে, যেমন কাজাখস্তান দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার শান্তি আলোচনার আয়োজন করছে। আবার আরব আমিরাত বর্তমানে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতাদের মধ্যে শান্তি আলোচনা আয়োজন করছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল এক ইস্যু।

এই অংশগ্রহণ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস দীর্ঘদিন রাশিয়ার প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও, সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরও রাশিয়া রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছে, বিশেষ করে সুরক্ষা জোট, পৃষ্ঠপোষকতা ও সংঘাত নিরসনের মাধ্যমে।

কিন্তু উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখানে হস্তক্ষেপমূলক ভূমিকা নেননি, বরং দ্বিপাক্ষিক উপকারে কাজ করে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। তারা একে একটি কৌশলগত করিডোর হিসেবে দেখছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যালান্সড ও অংশীদারিত্বভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে, যা চীন, রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি সমতাভিত্তিক।

চীন তার Belt and Road Initiative-এর মাধ্যমে বৃহৎ পরিকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ করেছে। তুরস্ক ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে প্রভাব রাখছে, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সহযোগিতা ও উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে উপস্থিত রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিটি দেশকে কৌশলে বাইরের শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হচ্ছে, যাতে তারা স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের কৌশলগত নিরপেক্ষতা বা dynamic neutrality দেখাতে পেরেছে। তারা রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছে এবং একযোগে কাজ করছে। এটি মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে তাদের ভূমিকা আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির বাইরেও, অঞ্চলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো লজিস্টিক রুট ও প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পগুলো, যা তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন Collective Security Treaty Organization-কে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে। আর্মেনিয়া রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে তুরস্ক-ঘনিষ্ঠ আজারবাইজানের সাফল্য দেখে নতুন বিকল্প ভাবছে। কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা দেশের মধ্যে ভারসাম্য রাখছে।

গালফ দেশগুলো এখানেও নতুন উপায়ে এগোচ্ছে। যদিও তাদের মূল আগ্রহ লজিস্টিক ও জ্বালানি খাতে, তবুও সৌদি আরব ও আমিরাত এখন নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতা। এই ধরনের ট্রান্সবর্ডার হুমকি—যেমন উগ্রবাদ, মানব ও মাদক পাচার, সাইবার অপরাধ—দুই অঞ্চলকেই প্রভাবিত করছে।

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতোই নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সমন্বয়পূর্ণ এবং লাভজনক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তারা এমন এক সময়ে সীমান্ত বিরোধ নিরসনে সাহায্য করতে পারে, যখন বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনে বহু দেশ সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত সক্ষমতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি সামলাতে কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে।

খালেদ আবু জাহর SpaceQuest Ventures-এর প্রতিষ্ঠাতা, যা একটি মহাকাশভিত্তিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম। তিনি EurabiaMedia-র প্রধান নির্বাহী এবং আল-ওয়াতান আল-আরাবি পত্রিকার সম্পাদক।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন