ধারণা বনাম বাস্তবতা: ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ আসলে কী দেখিয়ে দিল

ড. শিভান মাহেন্দ্ররাজাহ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৫, ১০:৫৩ এএম

১৩ জুন থেকে শুরু হওয়া "অপারেশন রাইজিং লায়ন" ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের নাম। পশ্চিমা গণমাধ্যমে একযোগে ইরানকে পারমাণবিক বোমার দ্বারপ্রান্তে বলা হয়, আর এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল চালায় ব্যাপক বিমান হামলা।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে ১৯৮১ সালে ইরাকের অসিরাক পারমাণবিক চুল্লিতে হামলার মতো ‘প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক হামলা’ বলে দাবি করেন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা নিছক আত্মরক্ষার হামলা নয়, বরং সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা।
এই হামলায় ২০০টির বেশি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। প্রথম ধাক্কায় ইরানের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়। মোসাদ ও তাদের স্থানীয় এজেন্টরা ভেতরে ঢুকে ড্রোন ও গাড়িবোমা ব্যবহার করে শহরের ভেতরে হামলা চালায়।
ইরান কি দুর্বল ‘শাসনব্যবস্থা’, না আগুনে পোড়া শক্ত রাষ্ট্র?
পশ্চিমা ধারণা ছিল, ইরান নিষেধাজ্ঞায় বিধ্বস্ত, জনগণ ক্ষুব্ধ, সরকার দুর্বল। কিন্তু এই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বরং, আক্রমণের মুখে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে বেশিরভাগ ইরানি রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে।
১৩ জুনের পরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী দ্রুত নতুন সেনা কমান্ডার নিয়োগ দেন এবং পাল্টা হামলার পরিকল্পনা সক্রিয় করেন। ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ) সরাসরি জাতীয় প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেয়।
ইরান ১৩, ১৪ ও ১৫ জুন পাল্টা হামলা চালায়, যেটা ছিল "অপারেশন ট্রু প্রমিস"-এর তৃতীয় ধাপ। হামলায় তেলআভিভ, হাইফা ও তিনটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি টার্গেট হয়।
একজন বিশ্লেষক বলেন, “আমি মনে করি না, এত সিনিয়র কমান্ডার হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল এত দ্রুত পাল্টা হামলা চালাতে পারত।”
আকাশে কার দখল?
শুরুতে মনে হচ্ছিল ইসরায়েল ইরানের আকাশে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে ইসরায়েলি জেট গুলি এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আবার সক্রিয় হয়।
অনেকে মনে করেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা সময় নেয় প্রতিক্রিয়ার জন্য, যেন ইসরায়েল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে পড়ে ভুল করে।
পুরনো প্রযুক্তির আইআর-১ সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হলেও আধুনিক আইআর-৬ ব্যবস্থাগুলো অক্ষত থাকে। কিছু ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত হয়েছে বলেও অসংখ্য অননুমোদিত প্রতিবেদন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মাইক মিহায়লোভিচ বলেন, “যেসব ভিডিও ইসরায়েল ছড়িয়েছে, তার তিন-চতুর্থাংশই ডামি বা প্রতারণামূলক টার্গেটে হামলার। আসল টার্গেট অক্ষত।”
জঙ্গি হামলার দিকে মোসাদের ঝুঁক:
যুদ্ধবিমানে বড় আকারে হামলা চালাতে না পেরে ইসরায়েল ড্রোন, গাড়িবোমা, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে।
১৫ জুন শুধু তেহরানেই পাঁচটি গাড়িবোমা বিস্ফোরণ হয়। হাসপাতাল, ডরমিটরি, আবাসিক ভবন এসব হামলার লক্ষ্য ছিল।
পশ্চিমা গণমাধ্যম এগুলোকে ‘স্ট্রাইক’ বলে অভিহিত করছে, যেন কোনো বিমান হামলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলো সন্ত্রাসবাদ।
এরপরেও, এ ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইরানিদের মধ্যে উল্টো একতা ও দেশপ্রেম সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় ঐক্য এবং ভিন্নমতও এখন একমত:
ইরাকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের মতো, ইসরায়েলও ভুল করে ভেবেছিল ইরানের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ দুর্বলতা। কিন্তু এবার ইরানের সব রাজনৈতিক মতবাদ একই কণ্ঠে কথা বলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সদেগ জিবাকালাম বলেন, “এই সরকার নিয়ে আমিই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছি। কিন্তু এখন শত্রুর সঙ্গে থাকা যায় না। মুজাহিদিন-ই-খালক সাদ্দামের পাশে ছিল, সেটা কি ঠিক হয়েছিল?”
সাবেক রাজনৈতিক বন্দী আলী গোলিজাদেহ বলেন, “সব সমালোচনা সত্ত্বেও আমি দেশের সেনাপতির পাশে আছি। এখন দেশের সম্মান রক্ষার সময়।”
সংস্কারপন্থী সাংবাদিক আলী নাজারি বলেন, “ইরানকে এখনই পারমাণবিক বোমা বানাতে হবে। একটি পারমাণবিক পরীক্ষা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হবে।”
১৫ জুন পর্যন্ত ২২৪ জন ইরানি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯০ শতাংশই সাধারণ মানুষ।
ইসরায়েলি দম্ভ কি ভাঙছে?
ইসরায়েল দাবি করেছে তারা ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ২০০টি প্রতিরক্ষা ইউনিট ধ্বংস করেছে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের বাহিনী এখনো সংঘবদ্ধভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।
বিশ্লেষক পাতারামেস ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “ইরানিদের আত্মবিশ্বাস এত বেশি যে তারা দলবেঁধে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে। এটাই ইসরায়েলের ‘এয়ার সুপিরিয়রিটি’।”
ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত:
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি (NPT) থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাঈ এই ইঙ্গিত দেন। সংসদে দ্রুত আইন পাশ হচ্ছে। লোকজন রাস্তায় পারমাণবিক পরীক্ষার দাবিতে স্লোগান দিচ্ছে।
পশ্চিমারা যখন ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে কিছু বলে না, তখন ইরানিদের মধ্যে ‘আমরাও পারমাণবিক শক্তি হব’—এই মনোভাব জোরালো হচ্ছে।
বিশ্ব প্রতিক্রিয়ায় দ্বিচারিতা:
ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, “আমি ইরানকে ৬০ দিনের সময় দিয়েছিলাম চুক্তি করতে। ইসরায়েল হামলা চালালো ৬১তম দিনে।”
জি সেভেন দেশগুলো চুপ করে আছে। কেউ ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেনি। অথচ ২০০১ সালে ইরানিরা ৯/১১-এর নিন্দা করেছিল। এখন তারা দেখছে, সেই পশ্চিমই তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মৌন সম্মতি দিচ্ছে।
ভুল কৌশলের প্রতিক্রিয়া:
ইসরায়েল চেয়েছিল ইরানের নেতৃত্ব ধ্বংস করতে, পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দিতে, এবং মনোবল ভেঙে দিতে। কিন্তু উল্টো হয়েছে—
ইরানের রাজনৈতিক শক্তি এক হয়েছে,
জনগণ একতাবদ্ধ হয়েছে,
পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে,
এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শক্তির মিথ ভেঙে পড়েছে।
এটা শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ নয়। এটা গল্পের যুদ্ধ, সম্মানের যুদ্ধ, ইতিহাসের যুদ্ধ।
‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ (প্রতিরোধ জোট) বিষয়টি ভালোভাবে বুঝেছে।
তেলআবিভ বোঝেনি।
ফারসি সিংহ এখন ক্ষুব্ধ। [দ্য ক্রাডল ডট কো থেকে অনুবাদ।]]