আল জাজিরার প্রতিবেদন
ইসরায়েল চেয়েছিল ইরানকে ভাঙতে, কিন্তু উল্টো তা ইরানকে একত্রিত হতেও সাহায্য করতে পারে

মোহাম্মদ ইসলামি
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৫, ০১:২৫ পিএম

১৮ জুন ২০২৫, ইসরায়েল-ইরান বিমানযুদ্ধ চলাকালে তেহরানের খোজির কমপ্লেক্সের দিকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ছবি: সোশ্যাল মিডিয়া/রয়টার্স
ইসরায়েলের চলমান হামলা এখন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপার যুদ্ধ অভিযানে পরিণত হয়েছে। এটা কেবল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো একটি সামরিক হামলা নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা এবং জটিল সাইবার আক্রমণ। এই হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সামরিক বাহিনীর তিন শীর্ষ কর্মকর্তা: মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, আইআরজিসির কমান্ডার হোসেইন সালামি এবং এর এয়ারোস্পেস ফোর্স প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ। ইরানের সেনা নেতৃত্বের ওপর এটাই সবচেয়ে বড় আঘাত ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর।
ইসরায়েল এই অভিযানকে প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি ঠেকাতে পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তবে এর প্রকৃত লক্ষ্য আরও গভীর: ইসলামিক রিপাবলিককে দুর্বল করে ধ্বংসের পথে নেওয়া। ইসরায়েল এবং কিছু মার্কিন কৌশলবিদ বহু বছর ধরেই মনে করেন, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা রোধের একমাত্র উপায় হলো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা এখন স্পষ্ট।
এই অভিযানের অংশ হিসেবে তেহরানে সরকারি ভবন এবং মন্ত্রণালয়ে সাইবার হামলা হয়েছে। জাতীয় টেলিভিশনের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এটা কেবল অস্ত্র প্রয়োগ নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও।
ইসরায়েলি সামরিক কর্তারা স্বীকার করেছেন, ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা তাদের পক্ষে অসম্ভব, কারণ সেগুলো ৫০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। এই ধরনের অভিযান সফল করতে হলে প্রয়োজন GBU-57 বোমা, যা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের B-2 বা B-52 বোমারু বিমান দিয়ে বহন করা সম্ভব। এই বাস্তবতা থেকেই ইসরায়েল মনে করে, সরকারের পতন ছাড়া ইরানকে ঠেকানো যাবে না।
ইসরায়েলি প্রচারণায় বলা হচ্ছে, এই যুদ্ধ ইরানের জনগণের নয়, বরং শাসকদের। প্রবাসে থাকা বিরোধী নেতারাও, যেমন রেজা পাহলভি ও ফুটবলার আলি করিমি, এই বার্তা সমর্থন করছেন এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে বাস্তবে এর প্রভাব উল্টো হতে শুরু করেছে। বহু ইরানি – যারা সরকারের সমালোচক ছিলেন – এখন বিদেশি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় সংহতির পক্ষে কথা বলছেন। তাদের কাছে এটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা। ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
২০২২ সালে 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের কর্মীরাও এখন বাইরের হামলার সঙ্গে নিজেদের আন্দোলনকে মেলাতে অনিচ্ছুক। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের ছবি এবং সেনাদের লাশ দেখে জনগণের আবেগ পরিবর্তিত হচ্ছে। তারা এখন রাজনৈতিক সংস্কার নয়, বরং মাতৃভূমির রক্ষায় একত্রিত হচ্ছে।
এমনকি শাসনের বিরোধীরাও সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছেন। ফুটবল কিংবদন্তি আলি দাই বলেছেন, "দেশদ্রোহী হওয়ার চেয়ে আমি মরতে রাজি।" সাবেক বিচারক ও রাজনৈতিক বন্দি মোহসেন বোরহানি লিখেছেন, "প্রতিরোধকারীদের হাত চুম্বন করি।"
এই হামলা ইরান সরকারের পতনের পরিবর্তে তার অবস্থান আরও শক্ত করছে। জাতীয় ঐক্য তৈরি হচ্ছে। দেশের ভেতর থেকে পরিবর্তনের বদলে বাইরের আগ্রাসন উল্টো ফল দিচ্ছে।
ইসরায়েলের যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া, তবে তারা হয়তো ভুলভাবে ইরানের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ও জাতীয় সংকটে জনগণের সংহতির শক্তিকে মূল্যায়ন করেছে। এখন, যখন বোমা পড়ছে আর জেনারেল মারা যাচ্ছেন, তখন ইরান ভেঙে পড়ছে না, বরং একত্রিত হচ্ছে।
মোহাম্মদ ইসলামি: সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মিনহো বিশ্ববিদ্যালয়, পর্তুগাল।