এপ্রিলে নির্বাচন: জনগণের স্বার্থে না সরকারের অভিপ্রায়ে?

ড: ফয়সাল কবির শুভ
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৫, ১২:৪২ পিএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে উত্তাপ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের উত্তাপ শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর দাবিদাওয়া বা আন্দোলন নিয়েই নয়; এই উত্তাপ প্রকৃত অর্থেই 'তাপদাহ' হয়ে উঠতে পারে সরকারের একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের কারণে।
প্রথমে কিছু বাস্তব তথ্য দেখা যাক।
নিউ এজ পত্রিকার ১৯ মার্চ ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে ভয়াবহ তাপদাহে অন্তত ১৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আবহাওয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে weatherspark.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গ্রাফ থেকে দেখা যায় (নিচের দুইটা গ্রাফ দ্রষ্টব্য) , গত বছর এবং তার আগের বছরেও মার্চের শেষ দিক থেকে ঢাকাতে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে শুরু করেছিল।
চিত্র ১: ঢাকাতে ২০২৪ সালে মাসিক তাপমাত্রার সার্বিক চিত্র
চিত্র ২: ঢাকাতে ২০২৩ সালে মাসিক তাপমাত্রার সার্বিক চিত্র
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে অন্যান্য বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি আবহাওয়াগত সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্নটি একান্তভাবে বিবেচ্য হওয়া উচিত। এক নজরে দেখলে দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনই শীতকালীন সময়ে—ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে—অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সময় আবহাওয়া থাকে সহনীয়, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে কম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেকটাই ছুটিতে থাকে, ফলে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার জন্য এটি আদর্শ সময়।
প্রসংগত, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল আমার জীবনে প্রথম নির্বাচনী অভিজ্ঞতা। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ থাকায় চলে যাই নানা বাড়িতে—বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে একটি গ্রামে। গ্রামের সেই নির্বাচনী পরিবেশ আজও মনে গেঁথে আছে: প্রতিদিন মিছিল, পোস্টার, হ্যান্ডবিল, শীতের সকালে ইছালে সওয়াব, পিঠা উৎসব, আর সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় নির্বাচনী আলোচনা। সে এক উৎসবমুখর পরিবেশ, যে পরিবেশ গণতান্ত্রিক চর্চাকে জীবন্ত করে তোলে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলাই যায়, নির্বাচনের সময় শুধু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়—সামাজিক ও জলবায়ুজনিত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা আজ যা দেখছি, তা ঠিক উল্টো।
বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি ও অন্যান্য মূলধারার দলগুলো বারবার দাবি করে আসছে যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন যেন ডিসেম্বরের মধ্যে আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে গত কয়েকদিন আগে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সাথে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনাতেও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একই দাবী পুনর্ব্যক্ত করেছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনুস ঘোষণা দিয়েছেন যে নির্বাচন হবে এপ্রিলের প্রথমার্ধে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই অসহনীয় গরমের সময়ে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত? এটা কি শুধুই ক্ষমতার অহঙ্কার? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দাবিকে উপেক্ষা করার একমুখী সিদ্ধান্ত? যদি ব্যক্তিগত 'ইগো'-র কারণে ডিসেম্বর বাদ দেওয়া হয়, তবে অন্তত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ তো ছিলই। সেই সুযোগ কেন নিলেন না?
এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—রমজান মাস আগামী বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হবে এবং মার্চে পড়বে ঈদ। এই পুরো সময়জুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা কার্যত অসম্ভব। তার ওপর এপ্রিল থেকে গরম বেড়ে গেলে জনগণ কীভাবে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবে?
সোজা কথা, নির্বাচন যদি ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারিতে আয়োজন করা হয়, তাহলে তার ফলাফলের বৈধতা, অংশগ্রহণ এবং গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, চার মাস আগে নির্বাচন দিলে যা অর্জন করা সম্ভব, তা এপ্রিল মাসে করতে চাওয়ার পেছনে ড. ইউনুসের উদ্দেশ্য কী?
আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, একটি ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে নির্বাচন হতে হবে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক এবং সহনীয় পরিবেশে। আর তার জন্য আদর্শ সময় হলো ডিসেম্বর এবং সর্বোচ্চ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। এর বাইরে গিয়ে জনগণকে অস্বস্তিতে ফেলে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় সরকারকেই নিতে হবে।
**লেখক একজন নগর বিশ্লেষক ও গবেষক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত বাংলাদেশের রাজনীতি ও নগর উন্নয়ন বিষয়ে লেখালেখি করেন।